ইসলামের ইতিহাসে তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের প্রথম যুগেই বহু তরুণ সাহাবি জ্ঞানচর্চা, দাওয়াত, প্রশাসন ও নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
আলী ইবনে আবি তালিব, মুসআব ইবনে উমাইর, ওসামা ইবনে জায়েদ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর মতো তরুণেরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে গড়ে উঠেছিলেন।
তাঁদের সবার যোগ্যতা এক ধরনের ছিল না। দায়িত্বও এক ছিল না। কিন্তু রাসুল (সা.) প্রত্যেকের স্বতন্ত্র সামর্থ্য বুঝেছেন এবং সেই সামর্থ্য বিকাশের সুযোগ দিয়েছেন।
তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর পদ্ধতি ছিল বাস্তবমুখী। তিনি শুধু উপদেশ দেননি, দায়িত্বও দিয়েছেন। ভুল হলে সংশোধন করেছেন, আবার আত্মবিশ্বাসও তৈরি করেছেন। ইমান ও মূল্যবোধ শেখানোর পাশাপাশি বাস্তব জীবনে সেগুলো প্রয়োগের সুযোগও দিয়েছেন।
হৃদয়ে জায়গা করে নিয়ে সংশোধন
কাউকে সংশোধন করার আগে তার সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া যায় আবু উমামাহ (রা.)-এর বর্ণনায়।
এক যুবক রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে ব্যভিচারের অনুমতি চেয়েছিল। উপস্থিত সাহাবিরা তার কথায় ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু রাসুল (সা.) তাকে ধমক দেননি।
তিনি বললেন, ‘তাকে আমার কাছে আসতে দাও।’
এরপর যুবককে কাছে বসিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি তোমার মায়ের জন্য এমনটা পছন্দ করবে?’
যুবক বলল, ‘না, আল্লাহর কসম।’
তিনি বললেন, ‘মানুষও তাদের মায়ের জন্য তা পছন্দ করে না।’
এরপর কন্যা, বোন, ফুফু ও খালার কথা উল্লেখ করলেন। প্রতিবার যুবক একই উত্তর দিল। শেষে রাসুল (সা.) তার জন্য দোয়া করলেন।
বর্ণনাকারী আবু উমামাহ (রা.) বলেন, এরপর ওই যুবকের কাছে ব্যভিচারের চেয়ে অধিক ঘৃণিত আর কিছু ছিল না।
সূত্র: মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২১১। এই বর্ণনায় যুবককে কাছে ডেকে তার মা, কন্যা, বোন, ফুফু ও খালার উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর ঘটনা পাওয়া যায়।
যোগ্যতা বুঝে দায়িত্ব
রাসুল (সা.) তরুণদের সবাইকে একই ছাঁচে গড়ে তোলেননি। কার মধ্যে কোন ধরনের যোগ্যতা আছে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্ব দিয়েছেন।
জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) ছিলেন দ্রুত শেখার ক্ষমতাসম্পন্ন একজন তরুণ সাহাবি। রাসুল (সা.) তাঁকে ইহুদিদের লেখার ভাষা শিখতে বলেন। জায়েদ (রা.) অল্প সময়েই তা আয়ত্ত করেন। এরপর ইহুদিদের পাঠানো চিঠি রাসুল (সা.)-কে পড়ে শোনাতেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে চিঠি লিখতেন।
সূত্র: সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৭১৫। তিরমিজির বর্ণনা অনুযায়ী, অর্ধমাসের মধ্যেই জায়েদ (রা.) প্রয়োজনীয় ভাষা ও লেখা শিখেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে জায়েদ ইবনে সাবিত (রা.) ওহি লেখকদের একজন হন এবং কোরআন সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের জন্য বিশেষ দোয়া
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মধ্যেও জ্ঞান অর্জনের বিশেষ সম্ভাবনা দেখেছিলেন রাসুল (সা.)।
তাঁর জন্য রাসুল (সা.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, তাঁকে ধর্মের গভীর জ্ঞান দান করুন এবং তাঁকে কোরআনের ব্যাখ্যা শিক্ষা দিন।’
সহিহ বুখারির ১৪৩ নম্বর হাদিসে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর জন্য দ্বীনের গভীর জ্ঞান দানের দোয়ার বর্ণনা রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) মুসলিম উম্মাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলেম ও কোরআনের ব্যাখ্যাকার হিসেবে পরিচিত হন।
প্রশংসার মাধ্যমে উন্নতির পথ দেখানো
তরুণ বয়সে আত্মবিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুল (সা.) প্রয়োজনমতো তরুণদের ভালো দিকের প্রশংসা করতেন, আবার একই সঙ্গে আরও উন্নতির পথও দেখিয়ে দিতেন।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ কতই না উত্তম মানুষ, যদি সে রাতে নামাজ পড়ত!’
ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘এর পর থেকে তিনি খুব কমই রাতের নামাজ ছেড়েছেন।’
সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১২১-১১২২। বিভিন্ন সংস্করণে এই বর্ণনার নম্বরায়নে সামান্য পার্থক্য রয়েছে।
এখানে সরাসরি ভর্ৎসনা না করে প্রথমে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-এর ভালো দিকের প্রশংসা করা হয়েছে, এরপর তাঁর উন্নতির আরেকটি ক্ষেত্র দেখানো হয়েছে।
তরুণ ওসামাকে সামরিক নেতৃত্ব
তরুণদের শুধু ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করিয়ে রাখেননি রাসুল (সা.)। যোগ্য মনে করলে তখনই তাঁদের বড় দায়িত্ব দিয়েছেন।
এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)।
রাসুল (সা.) তাঁকে একটি সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। সেই বাহিনীতে বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক প্রবীণ সাহাবিও ছিলেন। তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে কিছু মানুষ আপত্তি করলে নবীজি বলেন, ‘তোমরা যদি ওসামার নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করো, এর আগে তাঁর পিতার নেতৃত্ব নিয়েও আপত্তি করেছিলে। আল্লাহর শপথ, সে নেতৃত্বের উপযুক্ত ছিল। আর তার পরে ওসামাও আমার কাছে প্রিয় এবং নেতৃত্বের উপযুক্ত।’
সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৩০। এতে ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.)-এর নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তির জবাবে রাসুল (সা.)-এর বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে।
এ ঘটনা দেখায়, দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা থাকলে বয়সকে একমাত্র মাপকাঠি বানানো হয়নি।
মদিনায় তরুণ মুসআবের দায়িত্ব
মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) ছিলেন আরেক তরুণ সাহাবি, যাঁকে হিজরতের আগেই মদিনায় ইসলামের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
তিনি সেখানে মানুষকে কোরআন শেখাতেন এবং ইসলামের শিক্ষা দিতেন। তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে উসাইদ ইবনে হুদাইর ও সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণ করেন বলে সিরাতের বর্ণনায় পাওয়া যায়।
মুসআব (রা.)-কে হিজরতের আগে মদিনায় পাঠিয়ে মানুষকে কোরআন ও দ্বীন শেখানোর তথ্য প্রাচীন জীবনীগ্রন্থের বর্ণনায় পাওয়া যায়।
সূত্র: সিরাতে ইবনে হিশাম, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩৫-৪৩৬; সহিহ বুখারির সূত্রে আল-বারা ইবনে আজিব (রা.)-এর বর্ণনাতেও মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-এর মদিনায় গিয়ে কোরআন শেখানোর তথ্য রয়েছে।
কিশোর ইবনে আব্বাসকে জীবনদর্শনের শিক্ষা
তরুণদের দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত শক্ত করার দিকেও রাসুল (সা.) গুরুত্ব দিয়েছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) তখন কিশোর। একদিন তিনি রাসুল (সা.)-এর বাহনের পেছনে বসেছিলেন। তখন রাসুল (সা.) তাঁকে বললেন, ‘হে বৎস, আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শেখাব।’
এরপর বললেন, ‘আল্লাহর হুকুমের হেফাজত করলে আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। কিছু চাইলে আল্লাহর কাছে চাইবে। সাহায্য চাইলে আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখবে, সমগ্র মানুষ তোমার উপকার করতে চাইলেও আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন, তার বাইরে কিছু করতে পারবে না।’
সূত্র: সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬। তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান সহিহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক
রাসুল (সা.)-এর কাছে একদল তরুণ প্রায় ২০ দিন অবস্থান করে দ্বীনের শিক্ষা নিয়েছিলেন। তাঁদের পরিবারের প্রতি টান অনুভব করার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেন এবং বাড়ি ফিরে যেতে বলেন।
তবে যাওয়ার সময় তিনি বললেন, ‘তোমরা তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও, তাদের শিক্ষা দাও এবং তাদের সৎকাজের নির্দেশ দাও।’
সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৪৬। মালিক ইবনে হুয়াইরিস (রা.)-এর বর্ণনায় তরুণদের প্রায় ২০ দিন নবীজির কাছে থাকা এবং পরে পরিবারে ফিরে গিয়ে শিক্ষা দেওয়ার নির্দেশের কথা রয়েছে।
তাঁরা এসেছিলেন শিক্ষার্থী হয়ে, কিন্তু ফিরে গেলেন অন্যদের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে।
তরুণ গড়ার নববী পদ্ধতির শিক্ষা
এসব ঘটনা থেকে দেখা যায়, রাসুল (সা.) তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁদের কথা শোনা, ভালোবাসা ও আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা, স্বতন্ত্র যোগ্যতা শনাক্ত করা, ইতিবাচকভাবে ভুল সংশোধন করা, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং বাস্তব দায়িত্ব দেওয়া ছিল তাঁর পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তিনি শুধু তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করেননি। তাঁদের ওপর বর্তমানেই আস্থা রেখেছেন এবং সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত করেছেন।
আজকের পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজেও তরুণদের গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে। শুধু নির্দেশনা নয়, তরুণদের যোগ্যতা চিহ্নিত করা, তাদের ওপর আস্থা রাখা এবং বাস্তব দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়াও প্রয়োজন।