ইরানপন্থি হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রায় ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের মধ্যে আরও একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে এগিয়ে বাব আল-মান্দেবের ওপর চাপ বাড়িয়েছে হুথিরা। শুক্রবার বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যায়, ইয়েমেন ও আফ্রিকার মধ্যবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের কাছে অবস্থিত পেরিম দ্বীপে পৌঁছেছে তারা।
বাব আল-মান্দেবের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হলে ইরানের হাতে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব, এই দুই গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরের বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ ধরে রেখেছে। কিন্তু বাব আল-মান্দেবও ঝুঁকিতে পড়লে সৌদির এই বিকল্প রপ্তানি পথও অনিরাপদ হয়ে উঠতে পারে।
পরিস্থিতি সামলাতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সহায়তা চান বলে রয়টার্সকে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ না করে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করার অবস্থান নিয়েছে।
শনিবার ট্রাম্পও সৌদি যুবরাজের সঙ্গে তার ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে হুতিরাও তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানোর অনুরোধ করেছে বলে জানান তিনি।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় দেশগুলোকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দিতে চায় ওয়াশিংটন।
বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযান চালালে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে নৌ ও বিমান শক্তি মোতায়েন করতে হতে পারে। এতে ইরানকে ঘিরে ইতোমধ্যে সক্রিয় মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
অন্যদিকে হুতিদের বাব আল-মান্দেবের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়তে দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হতো। বাব আল-মান্দেবও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়লে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ও বাণিজ্য উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ডেভিড শেনকারের মতে, ইরান যদি হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি চোকপয়েন্টে তেহরানের প্রভাব তৈরি হবে।
এখন ট্রাম্পের সামনে মূলত দুটি পথ রয়েছে। হুতিদের ঠেকাতে সীমিত মার্কিন সামরিক সহায়তা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা, অথবা সৌদি আরব ও তার মিত্রদের নেতৃত্বে হুতিদের মোকাবিলা করতে দেওয়া।
তবে সরাসরি মার্কিন অভিযান শুরু হলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। ফলে হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবের পরিস্থিতি এখন শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবের বিষয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স