কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের পাল্টাপাল্টি হামলা জোরদার হওয়ায় বিশ্বজুড়ে শস্য সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাহাজ ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোয় হামলার কারণে খাদ্যশস্যের রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, আগস্টে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যসূচকের গড় ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে উঠেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। এরই মধ্যে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
তুরস্কের নাবিক ইউনিয়নের হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে কৃষ্ণসাগরে ৩৫টি জাহাজ হামলার শিকার হয় এবং এতে ২৩ জন নিহত হন। আগস্টেও হামলা অব্যাহত ছিল। ফলে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন—দুই দেশই কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে একে অপরের জাহাজ ও বন্দর স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। রাশিয়া ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানি কেন্দ্র ওদেসা ও চর্নোমর্স্ক বন্দরে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইউক্রেন ড্রোন ব্যবহার করে রুশ জাহাজ ও ট্যাংকারে হামলা করেছে। কিয়েভের দাবি, হামলার শিকার কিছু ট্যাংকার রাশিয়ার ‘ছায়া নৌবহরের’ অংশ।
রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নভোরোসিস্কেও ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে। বন্দরটি দেশটির তেল ও শস্য রপ্তানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতের কারণে কৃষ্ণসাগরের পাশাপাশি আজভ সাগরেও জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে।
রাশিয়া বিশ্বের অন্যতম প্রধান শস্য রপ্তানিকারক। দেশটির সমুদ্রপথে রপ্তানি করা শস্যের ৭০ শতাংশের বেশি কৃষ্ণসাগরের বন্দর দিয়ে এবং প্রায় ২০ শতাংশ আজভ সাগর দিয়ে যায়। ফলে এসব এলাকায় সংঘাত বাড়ায় রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়ার শস্য রপ্তানি স্বাভাবিক সক্ষমতার মাত্র ৪০ শতাংশে নেমে আসে। বিকল্প হিসেবে কাস্পিয়ান, বাল্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় পথ ব্যবহার করে কিছু পণ্য রপ্তানি করা হলেও তা ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারছে না।
ইউক্রেনও চলতি বছর ভালো শস্য উৎপাদন করেছে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে সমুদ্রপথে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির সম্ভাব্য রপ্তানির তুলনায় বাস্তবে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ শস্য বিদেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, শস্য সরবরাহে এই বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে গম, যব ও ভুট্টার মতো পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলো এ পরিস্থিতিতে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে খাদ্যের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বাড়তে পারে। পরের বছরও আরও ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২২ সালের মতো বড় ধরনের খাদ্য সংকট এবার নাও হতে পারে, কারণ অনেক দেশ ইতিমধ্যে পর্যাপ্ত শস্য মজুত করেছে।
তারপরও রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক শস্য সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে এবং এর প্রভাব বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।