ফিলিস্তিন ইস্যুতে জনমত প্রভাবিত করার প্রচেষ্টার পর এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করার একটি কথিত প্রচারণার অভিযোগ সামনে এসেছে।
আল জাজিরার একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েলের অর্থায়নে পরিচালিত একটি প্রভাব বিস্তারকারী নেটওয়ার্ক সার্চ ইঞ্জিনের ফলাফল এবং এআই চ্যাটবটের উত্তরকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে কনটেন্ট তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনটিতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘হ্যানোভার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির বাস্তব কার্যালয়, শনাক্তযোগ্য গবেষক কিংবা উল্লেখযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট বা এফএআরএ-এর অধীনে দাখিল করা নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই কার্যক্রমের অর্থায়নের সঙ্গে ইসরায়েলের সরকারি বিজ্ঞাপন সংস্থা লাপামের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। নিউইয়র্কভিত্তিক বিজ্ঞাপন সংস্থা পিরো ইনকর্পোরেটেড ইসরায়েলি অ্যাকাউন্টের জন্য প্রায় ৯ লাখ ডলারের ডিজিটাল যোগাযোগ কার্যক্রমে যুক্ত ছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই প্রচারণার বিশেষ দিক ছিল এআই সিস্টেমকে লক্ষ্য করে কনটেন্ট তৈরি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র নয় দিনে হ্যানোভার নামের ওই ওয়েবসাইটে ৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি শব্দের ১২৪টি একাডেমিক ধাঁচের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
এসব প্রতিবেদনে এমন কিছু প্রশ্নকে কেন্দ্র করে কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছিল, যেগুলো মানুষ এআই চ্যাটবটকে জিজ্ঞাসা করতে পারে। এর মধ্যে গাজায় অনাহার পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে ঘিরে বিভিন্ন বিতর্কিত প্রশ্নও ছিল।
পিরো এই কৌশলকে ‘এআই স্টোরি অপটিমাইজেশন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ এমনভাবে কনটেন্ট তৈরি করা, যাতে সার্চ ইঞ্জিনে তা সহজে দৃশ্যমান হয় এবং বড় ভাষা মডেল বা এলএলএম সেটি সহজে খুঁজে ও প্রক্রিয়াজাত করতে পারে।
এখানেই প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণার সঙ্গে এই কৌশলের বড় পার্থক্য। লক্ষ্য শুধু মানুষের কাছে সরাসরি কোনো বার্তা পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং মানুষ যখন এআইয়ের কাছে কোনো প্রশ্ন করবে, তখন সেই উত্তরের তথ্যভিত্তিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পলিটিকোর পরীক্ষায় চ্যাটজিপিটি ও পারপ্লেক্সিটি গাজা, জায়নবাদ-বিরোধিতা এবং ইহুদি-বিদ্বেষ নিয়ে কিছু নিরপেক্ষ প্রশ্নের উত্তরে হ্যানোভার ইনস্টিটিউটের তথ্য উদ্ধৃত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের জন্য এখানেই বড় উদ্বেগের জায়গা। কারণ এআই সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিজে থেকে বুঝতে পারে না। একটি ওয়েবসাইটে গবেষণাধর্মী ভাষা, পরিসংখ্যান, চার্ট, উদ্ধৃতি ও একাডেমিক কাঠামো থাকলে সেটিকে আপাতদৃষ্টিতে বিশ্বাসযোগ্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি থাকে।
ফলে কোনো পক্ষ যদি পরিকল্পিতভাবে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট তৈরি করে ইন্টারনেটের তথ্যভাণ্ডারে ঢুকিয়ে দিতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে সেই তথ্য এআইয়ের তৈরি উত্তরের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর। কারণ ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে বহু দশকের দখলদারিত্ব, বসতি স্থাপন, বাস্তুচ্যুতি, যুদ্ধ, মানবিক সংকট ও আন্তর্জাতিক তদন্তের বিপুল তথ্য ইতোমধ্যে রয়েছে। এই জটিল বাস্তবতার মধ্যে কোনো পক্ষের পরিকল্পিতভাবে তথ্যের একটি নির্দিষ্ট বয়ানকে সামনে নিয়ে আসা এআইয়ের উত্তরকে প্রভাবিত করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। ভবিষ্যতে সরকার, রাজনৈতিক সংগঠন, করপোরেশন কিংবা বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী যদি এআইয়ের তথ্যভাণ্ডারকে প্রভাবিত করার জন্য একই কৌশল ব্যবহার করে, তাহলে সাধারণ ব্যবহারকারী কীভাবে বুঝবেন কোন তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা এবং কোনটি পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা?
এ কারণে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু চ্যাটবটের উত্তর নয়, উত্তরটির উৎসও যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো এআই সিস্টেম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কোনো তথ্য উপস্থাপন করলেই সেটিকে স্বাধীন বা নিরপেক্ষ সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। এআই যে তথ্যের ওপর নির্ভর করে, সেই তথ্যের উৎস, প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় এবং স্বার্থের সম্পর্ক যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হ্যানোভার ইনস্টিটিউটকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ তাই শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের তথ্যযুদ্ধের বিষয় নয়। এটি এআই যুগে তথ্য, প্রচারণা এবং সত্য যাচাইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
সূত্র: আল জাজিরা