ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

হিমালয় থেকে নেমে এলো ‘স্থলভাগের সুনামি’, বিপর্যস্ত নেপাল-ভারত

হিমালয় থেকে নেমে এলো ‘স্থলভাগের সুনামি’, বিপর্যস্ত নেপাল-ভারত
ছবি: সংগৃহীত
ফলো করুন

২৬ আগস্ট সকালে চীন-নেপাল সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে শুরু হয় ভয়াবহ এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। পাঁচ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় একটি শক্তিশালী ভূকম্পন শনাক্ত হওয়ার পর পাহাড়ের একটি অংশ হিমবাহ, বরফ, পাথর ও মাটি নিয়ে ধসে পড়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ ধ্বংসাবশেষের স্রোত। 

শুরুতে ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে ধারণা করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, ভূকম্পনটি সম্ভবত নেপালের লাংটাং ন্যাশনাল পার্কে হিমবাহ-জড়িত একটি বিশাল ভূমিধস থেকে সৃষ্টি হয়েছে। ইউএসজিএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ধসের ফলে উৎপন্ন শক্তি প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল। 

তবে ভারতের রিমোট সেনসিং কেন্দ্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, ৪ দশমিক ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হিমবাহ ধসের সূত্রপাত ঘটিয়ে থাকতে পারে। ফলে ঠিক কোন ঘটনাটি আগে ঘটেছিল, অর্থাৎ ভূমিকম্প থেকে ধস নাকি ধস থেকেই ভূকম্পন, তা নিয়ে এখনো বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ চলছে।তবে এরপরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বড় ধরনের মতভেদ নেই। পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহে বাধা তৈরি করে। পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ প্রবল বেগে নিচের দিকে ছুটে যায়। প্রথমে চীনের সীমান্তবর্তী গিয়েরং বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ভয়াবহ ঢল প্রবেশ করে নেপালে। 

লহেন্দে খোলা, ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীপথ ধরে ধ্বংসাবশেষের স্রোত প্রায় ১০০ কিলোমিটার অতিক্রম করে। নেপালের জলবিদ্যা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্রোতটি প্রথম ২২ কিলোমিটার পথ গড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১৯৩ কিলোমিটার গতিতে অতিক্রম করে। এই কারণেই এত অল্প সময়ে বিপুল এলাকা ধ্বংসের মুখে পড়ে। 

রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংসহ নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই ঢলের ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। ১০টিরও বেশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়, যা দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১২ শতাংশেরও বেশি। আকস্মিক ও অত্যন্ত দ্রুতগতির এই স্রোতকে বিশেষজ্ঞরা অনেকটা স্থলভাগের সুনামির সঙ্গে তুলনা করেছেন। 

এরপর ত্রিশূলী নদীর পানি নারায়ণী নদীর মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করে। বিহারে এই নদী গান্ডাক নামে পরিচিত। সেখানে গান্ডাক ব্যারেজে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সতর্কতা জারি করা হয়। ব্যারেজের ৩৬টি গেট খুলে দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে পানির নিষ্কাশন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কিউসেকে পৌঁছে। 

উত্তরপ্রদেশেও পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়। নেপাল থেকে ভেসে আসতে পারে বলে ধারণা করা সাতটি মরদেহ সেখানকার নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

তবে দুর্যোগের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ধ্বংসাবশেষ জমে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছিল। চীনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির পানি ধীরে ধীরে কমছে এবং বাঁধ ভেঙে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কাও আগের তুলনায় কমেছে। তবে আরও একটি বড় হ্রদ শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। 

২৬ আগস্টের এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাণহানি, নিখোঁজ ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড ও প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলছে। 

সূত্র: এনডিটিভি

ট্যাগ : নেপাল তিব্বত আকস্মিক বন্যা

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


হিমালয় থেকে নেমে এলো ‘স্থলভাগের সুনামি’, বিপর্যস্ত নেপাল-ভারত

প্রকাশের তারিখ : ৩০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

২৬ আগস্ট সকালে চীন-নেপাল সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে শুরু হয় ভয়াবহ এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। পাঁচ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় একটি শক্তিশালী ভূকম্পন শনাক্ত হওয়ার পর পাহাড়ের একটি অংশ হিমবাহ, বরফ, পাথর ও মাটি নিয়ে ধসে পড়ে। সেখান থেকেই শুরু হয় ভয়াবহ ধ্বংসাবশেষের স্রোত। 

শুরুতে ঘটনাটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে ধারণা করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, ভূকম্পনটি সম্ভবত নেপালের লাংটাং ন্যাশনাল পার্কে হিমবাহ-জড়িত একটি বিশাল ভূমিধস থেকে সৃষ্টি হয়েছে। ইউএসজিএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ধসের ফলে উৎপন্ন শক্তি প্রায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ছিল। 

তবে ভারতের রিমোট সেনসিং কেন্দ্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, ৪ দশমিক ৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হিমবাহ ধসের সূত্রপাত ঘটিয়ে থাকতে পারে। ফলে ঠিক কোন ঘটনাটি আগে ঘটেছিল, অর্থাৎ ভূমিকম্প থেকে ধস নাকি ধস থেকেই ভূকম্পন, তা নিয়ে এখনো বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ চলছে।তবে এরপরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বড় ধরনের মতভেদ নেই। পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীর প্রবাহে বাধা তৈরি করে। পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষ প্রবল বেগে নিচের দিকে ছুটে যায়। প্রথমে চীনের সীমান্তবর্তী গিয়েরং বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ভয়াবহ ঢল প্রবেশ করে নেপালে। 

লহেন্দে খোলা, ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীপথ ধরে ধ্বংসাবশেষের স্রোত প্রায় ১০০ কিলোমিটার অতিক্রম করে। নেপালের জলবিদ্যা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্রোতটি প্রথম ২২ কিলোমিটার পথ গড়ে ঘণ্টায় প্রায় ১৯৩ কিলোমিটার গতিতে অতিক্রম করে। এই কারণেই এত অল্প সময়ে বিপুল এলাকা ধ্বংসের মুখে পড়ে। 

রাসুয়া, নুওয়াকোট ও ধাদিংসহ নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় এই ঢলের ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। ১০টিরও বেশি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়, যা দেশটির মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১২ শতাংশেরও বেশি। আকস্মিক ও অত্যন্ত দ্রুতগতির এই স্রোতকে বিশেষজ্ঞরা অনেকটা স্থলভাগের সুনামির সঙ্গে তুলনা করেছেন। 

এরপর ত্রিশূলী নদীর পানি নারায়ণী নদীর মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করে। বিহারে এই নদী গান্ডাক নামে পরিচিত। সেখানে গান্ডাক ব্যারেজে পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সতর্কতা জারি করা হয়। ব্যারেজের ৩৬টি গেট খুলে দেওয়া হয় এবং একপর্যায়ে পানির নিষ্কাশন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কিউসেকে পৌঁছে। 

উত্তরপ্রদেশেও পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জারি করা হয়। নেপাল থেকে ভেসে আসতে পারে বলে ধারণা করা সাতটি মরদেহ সেখানকার নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

তবে দুর্যোগের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ধ্বংসাবশেষ জমে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছিল। চীনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটির পানি ধীরে ধীরে কমছে এবং বাঁধ ভেঙে নতুন করে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কাও আগের তুলনায় কমেছে। তবে আরও একটি বড় হ্রদ শনাক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। 

২৬ আগস্টের এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাণহানি, নিখোঁজ ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড ও প্রতিকূল আবহাওয়া উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলছে। 

সূত্র: এনডিটিভি


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ