সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের সব সমস্যা সমাধান করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। তিনি বলেন, বড় ধরনের সমস্যা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সংসদ ভবনে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সংসদীয় কমিটি, বিরোধী দলের ভূমিকা, সংবিধান সংশোধন এবং আসন্ন বিভিন্ন বিল নিয়ে কথা বলার সময় তিনি এসব মন্তব্য করেন।
চিফ হুইপ জানান, আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় কমিটি গঠনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সদস্যদের নাম পাওয়া গেলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি বলেন, তৃতীয় অধিবেশন পাঁচ, সাত কিংবা ১০ দিনের হতে পারে। তবে সংসদীয় কার্যক্রমের প্রয়োজন অনুযায়ী অধিবেশনের মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
নূরুল ইসলাম মনি জানান, এবারের অধিবেশনে প্রায় ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তর, গুম এবং মানবাধিকার সুরক্ষাসংক্রান্ত আইন উল্লেখযোগ্য।
সম্পত্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে তিনি বলেন, বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পরও জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার বজায় রাখবেন। এর মাধ্যমে সম্পত্তি পাওয়ার পর বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জুলাই সনদ ও সংবিধান সংশোধন প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, জুলাই সনদের ধারাবাহিকতায় জনগণ নির্বাচনী ইশতেহার বিবেচনা করে ভোট দিয়েছে। জনগণের দেওয়া এই আস্থার ভিত্তিতেই বর্তমান সরকার দায়িত্ব পালন করছে। দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন আইন প্রণয়ন ও বিদ্যমান আইনে সংশোধন আনা হবে।
তিনি বলেন, সংবিধানের সামান্য পরিবর্তনও সংবিধান সংস্কারের অংশ। জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত অঙ্গীকার রয়েছে এবং সেই অঙ্গীকারের বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সরকার কাজ করবে।
সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রস্তাবিত কাঠামোতে বিএনপি থেকে সাতজন এবং জামায়াত থেকে পাঁচজন সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিদেরও কমিটিতে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। বিরোধী দল তাদের সদস্যদের নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনের দাবি জানানো বিরোধী দলের দায়িত্ব। তিনি আশা করেন, বিরোধী দল সংসদের বাইরে অস্থিরতা সৃষ্টি না করে জনগণের সমস্যা ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরবে।
নূরুল ইসলাম মনি বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বিরোধী দল সংসদে এসে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেবে এবং আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করবে—এটাই প্রত্যাশা।
সরকারের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তিনি বলেন, বড় প্রকল্প বা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মতো কাজ সম্পন্ন করতে কয়েক বছর সময় লাগে। তাই মাত্র ছয় মাসে দীর্ঘদিনের সব সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়। দেশের মানুষকে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন চুক্তি প্রসঙ্গে চিফ হুইপ অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময়ে করা কিছু চুক্তি দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার কারণে জনগণের অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ চুক্তির সমালোচনা করে তিনি এটিকে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এসব চুক্তির আর্থিক বোঝা থেকে বেরিয়ে আসতে জাতীয়ভাবে সহযোগিতা প্রয়োজন।
চিফ হুইপ বলেন, তৃতীয় অধিবেশনের মাধ্যমে সংসদীয় কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে। আইন প্রণয়ন, সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদ আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
মন্তব্যসমূহ