ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের ছোট কৃষিপ্রধান গ্রাম কুলাক। একসময় সেখানে দিনের কাজকর্ম নির্ভর করত জেনারেটরের ওপর। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পরই বন্ধ হয়ে যেত পানির পাম্প ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা। সন্ধ্যা নামলে বিদ্যুতের অভাবে পড়াশোনায়ও সমস্যায় পড়ত শিশুরা।
এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। সৌরবিদ্যুতের কল্যাণে কুলাকের বাসিন্দারা পাচ্ছেন ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ। দিনের বেলায় সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যা রাতে বা সূর্যের আলো না থাকলে ব্যবহার করা যায়।
এই পরিবর্তনের সুফল সবচেয়ে বেশি পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকায় পানির পাম্প চালিয়ে সেচ দেওয়া সহজ হয়েছে। শীতল সংরক্ষণাগার ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ফসল কাটার পরপরই কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে না। কৃষকেরা ভালো বাজারমূল্যের জন্য অপেক্ষা করতে পারছেন।
বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরাকের অনেক গ্রামীণ এলাকায় এখনো নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে। পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলছে তীব্র গরম ও দীর্ঘস্থায়ী খরা। গ্রীষ্মকালে দেশটির তাপমাত্রা প্রায়ই ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষিজমি শুকিয়ে যাওয়া এবং পানির সংকট বাড়তে থাকায় অনেক গ্রামীণ পরিবার জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে তাদের সামনে নিজ এলাকায় থেকে কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়া অথবা কাজের সন্ধানে শহরে চলে যাওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎকে শুধু জাতীয় গ্রিড পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত সাময়িক বিকল্প হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কুলাকসহ কুর্দিস্তান অঞ্চলের পাঁচটি গ্রামে এমন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রকল্পে শুধু সৌর প্যানেল স্থাপন নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের সেগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়েও কাজ চলছে। সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে কৃষকেরা ডিজেলনির্ভর সেচ কমানো, ফসল সংরক্ষণ এবং গ্রামেই কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বাড়তি মূল্য সংযোজনের সুযোগ পাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সৌর প্যানেল স্থাপন করলেই একটি প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে সফল হয় না। ইনভার্টার বা অন্য কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে স্থানীয়ভাবে তা মেরামতের সক্ষমতা না থাকলে পুরো ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়তে পারে। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয় দক্ষ জনবল তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কুলাকের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, সৌরবিদ্যুতের সুফল শুধু ঘরে আলো জ্বালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সচল পানির পাম্প, শীতল সংরক্ষণাগার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের মাধ্যমে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে এই মডেল ইরাকজুড়ে ছড়িয়ে দিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, সরকারি নীতি সহায়তা এবং কৃষি ও জ্বালানি খাতের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। কুলাকের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রযুক্তির পাশাপাশি সেই প্রযুক্তি পরিচালনাকারী মানুষ ও স্থানীয় জীবিকার ওপর বিনিয়োগই টেকসই জ্বালানি রূপান্তরের অন্যতম চাবিকাঠি।
সূত্র: আলজাজিরা
মন্তব্যসমূহ