দেশের ব্যাংকিং খাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে ‘এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য: চট্টগ্রাম অঞ্চলের সম্ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় ব্যাংকের অনিয়মের বিষয়ে সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ রেখে পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকদের নির্দেশ দেন মো. মোস্তাকুর রহমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. হানিফ মিয়ার সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ এবং প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম।
সভায় উপস্থাপিত ধারণাপত্রে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামষ্টিক অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সমস্যা এবং সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। এতে জানানো হয়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ২০০টি শিল্পকারখানা বন্ধ অথবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী বর্তমানে বেকার। একই সঙ্গে এসব খাতে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা খেলাপি ও অবাণিজ্যিক ঋণ জমেছে।
ধারণাপত্রে বলা হয়, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালু করা গেলে প্রায় ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানো ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে জ্বালানি সংকট, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির ঘাটতি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও অপারেটরের অভাব এসব শিল্প পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে বড় বাধা।
এ ছাড়া অলস জমির বিকল্প ব্যবহার, আইনি জটিলতা দূর করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়।
সভায় জানানো হয়, জাতীয় অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ, আমদানির ২১ শতাংশ, রেমিট্যান্সের ২৮ শতাংশ, মোট আমানতের ১৯ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং মোট ঋণের প্রায় সাড়ে ১৮ শতাংশ এ অঞ্চল থেকে আসে।
আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে এসএমই ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর নির্দেশনা দেন গভর্নর। পাশাপাশি ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ নীতির বাস্তবায়ন, ব্লু-ইকোনমি, সামুদ্রিক সম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ম্যানমেড ফাইবার খাতে দীর্ঘমেয়াদি এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়িয়ে নির্দিষ্ট চাহিদার ভিত্তিতে বিদেশে পাঠানো এবং প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের কার্যক্রম আরও জোরদারের বিষয়েও নির্দেশনা দেন গভর্নর।
সভায় ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো এবং ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ে তুলতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়।
ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মধ্যে পড়তে পারে। কর্মসংস্থান বাড়াতে আঞ্চলিক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আয় ও আর্থিক বৈষম্য কমানো এবং সম্পদের সুষম বণ্টনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভা শেষে গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে উন্নত ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন তিনি।