ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর অভিযোগের মুখে তথ্য প্রকাশের পদ্ধতি বদলেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। একই সঙ্গে তারা স্বীকার করেছে, চলতি মাসে আহত সেনার সংখ্যা আগে প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় বেশি।
রোববার, ২৬ জুলাই পেন্টাগনের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, ৭ জুলাইয়ের পর থেকে সংঘাতে আহত সেনাদের হিসাব মূল তালিকার পরিবর্তে আলাদা একটি বিভাগে প্রকাশ করা হচ্ছে। নতুন বিভাগটির শিরোনাম রাখা হয়েছে ‘বিদেশে পরিচালিত সামরিক অভিযানে হতাহত’।
ফলে ইরান সংঘাতে মোট কতজন মার্কিন সেনা নিহত ও আহত হয়েছেন, তা জানতে এখন দুটি আলাদা তালিকার তথ্য একসঙ্গে হিসাব করতে হচ্ছে।
ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেমে ইরান যুদ্ধে নিহত চার সেনার নাম আবার যুক্ত করা হয়েছে। এর আগে ওয়েবসাইট থেকে তাদের তথ্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে এবার তাদের নাম মূল তালিকায় না রেখে নতুন বিভাগে প্রকাশ করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের পর ৭ জুলাই থেকে আহত সেনার সংখ্যা আগের হিসাবের তুলনায় ১৪২ জন বেড়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের পর আহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ২০৭ জন।
এ ছাড়া ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে মোট আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২৪ জনে। নিহত সেনার সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৮।
এর আগে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেছিলেন, ৭ জুলাইয়ের পর আহত সেনার সংখ্যা ১০০-এর কম। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় আহত সেনাদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সে সময় প্রকাশ করা হয়নি।
পেন্টাগনের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠলেও পারনেল তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা নিহত হওয়ার পর জনমনে উদ্বেগ তৈরির উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
নতুন হিসাব ও তথ্য প্রকাশের পদ্ধতি নিয়ে পেন্টাগনের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে এক মুখপাত্র হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইরান যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা ১৮ থেকে কমিয়ে ১৪ দেখানো হয়। এ ঘটনায় সাবেক সেনাসদস্য, নিহতদের পরিবার এবং কয়েকজন আইনপ্রণেতার মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেন, জর্ডান ও ইরাকে সাম্প্রতিক হামলায় আরও চার মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। যুদ্ধবিরতির পর তাদের মৃত্যু হওয়ায় পেন্টাগনের প্রকাশিত হিসাবে পরিবর্তন আনা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত প্রেস সেক্রেটারি জোয়েল ভালদেজ পরে জানান, ওয়েবসাইটে তথ্য পরিবর্তনের ঘটনা একটি সাময়িক ত্রুটির কারণে ঘটেছে। দ্রুত তা সংশোধনের আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি।
তবে কয়েক দিন পরও মূল তালিকায় নিহতের সংখ্যা ১৪ দেখানো হচ্ছিল। পরে নতুন একটি বিভাগ খুলে অতিরিক্ত চার সেনার মৃত্যুর তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়।
এ ঘটনায় ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের একটি দল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে চিঠি দিয়েছে। তারা ইরান সংঘাতে নিহত ও আহত মার্কিন সেনাদের পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
সিনেটরদের ভাষ্য, যুদ্ধে কতজন সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন, সে তথ্য জানার অধিকার মার্কিন জনগণ, কংগ্রেস, সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিরক্ষা দপ্তর সময়মতো এবং ধারাবাহিকভাবে পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করেনি।
এদিকে ১৯৭৩ সালের ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান চালাতে পারেন না।
এই আইন সামনে রেখে প্রতিনিধি পরিষদ আবারও একটি প্রস্তাব পাস করেছে। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করা অথবা কংগ্রেসের অনুমোদন নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষ ও উদ্বেগকে আরও স্পষ্ট করেছে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস