বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিরোধের একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল বলে দাবি করেছেন সংগীতশিল্পী ও বিসিবির সাবেক পরিচালক আসিফ আকবর। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আইসিসির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার সময় এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার পর দেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে তাঁরা আর বিষয়টি এগিয়ে নেননি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্সের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
আসিফ আকবর জানান, বিসিবির তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিরোধের সময় আইসিসির সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা। বৈঠকে দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ের দুজন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
তাঁর দাবি, একপর্যায়ে বিষয়টি আরবিট্রেশন বা সালিশি প্রক্রিয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়। তখন জিম্বাবুয়ের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ক্রিকেট নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেন।
আসিফের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা চারজনের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে রাজধানীর রেডিসন হোটেলে অবস্থান করছিলেন।
জিম্বাবুয়ের যে প্রতিনিধি সতর্ক করেছিলেন, তিনি অতীতে দেশটির ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান ছিলেন। তাঁর দায়িত্বকালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বাংলাদেশের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয় বলে জানান আসিফ।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ হলে দেশের ক্রিকেটের বড় ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। বিশেষ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে তাঁরা আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে আইসিসি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এমন কোনো তথ্য দেননি তিনি।
অনুষ্ঠানে বিসিবির আগের পরিচালনা পর্ষদ গঠন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আসিফ আকবর।
তাঁর অভিযোগ, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সহযোগিতা এবং বিসিবির সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বোর্ড গঠন করা হয়েছিল।
বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের ক্ষমতার অপব্যবহার ও আঞ্চলিক প্রভাব কাজে লাগানো হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে অনুষ্ঠানে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা প্রমাণ উপস্থাপনের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বিসিবির বর্তমান পরিচালনা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়েও সমালোচনা করেন এই সংগীতশিল্পী।
আসিফ দাবি করেন, তাঁরা দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দেড় মাসের মধ্যে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) আয়োজন করেছিলেন। অথচ বর্তমান বোর্ডের সময়ে নতুন আসর আয়োজন নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, ক্রিকেটের মূল কার্যক্রমে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিয়ে বোর্ডকে আড্ডার জায়গায় পরিণত করা হয়েছে।
বিসিবির আর্থিক কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ তোলেন আসিফ।
তিনি জানান, তাঁদের সময়ে পাঁচ লাখ টাকার বেশি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণের নিয়ম করা হয়েছিল।
কিন্তু বর্তমান সময়ে কোটি টাকার কাজও দরপত্র ছাড়া করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আসিফের দাবি, টার্ফ জোন নির্মাণ ও ফ্যান স্থাপনের মতো কাজে গুরুত্ব দেওয়া হলেও দেশের ক্রিকেট পরিচালনার মূল দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না।
তবে কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে বা কোন কাজ দরপত্র ছাড়া সম্পন্ন হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট নথি বা হিসাবের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠানে দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার আহ্বান জানান আসিফ আকবর।
তিনি বলেন, ন্যাশনাল স্পোর্টস অ্যালায়েন্সের উচিত কোনো রাজনৈতিক দলের অনুসারী সংগঠন হিসেবে কাজ না করে স্বাধীনভাবে ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
পাশাপাশি প্রশাসনিক দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং খেলার মাঠের সংকটের বিষয়গুলো তুলে ধরেন তিনি।
কিশোর গ্যাং ও তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আসিফ।
তাঁর মতে, খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা এবং ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা তরুণদের অপরাধের দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমস্যা মোকাবিলা না করে কিশোরদের খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এ লক্ষ্যে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নিয়ে প্রথম টুর্নামেন্ট আয়োজনের প্রস্তাবও দেন আসিফ আকবর।
অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম এবং দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্যসমূহ