তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে গঠিত মজুরি বোর্ড দ্রুত কার্যক্রম শুরু করবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে চলমান আন্দোলন থেকে সরে এসে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (২ নভেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ে পোশাকশিল্পের শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রোববার (১ নভেম্বর) নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সোমবারই বোর্ডের প্রথম বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তা না হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বৈঠক শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের অন্যতম দাবি ছিল দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা।
এ লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের প্রতিনিধি মনোনয়নের অনুরোধ জানান। মালিকপক্ষ প্রতিনিধি দিলেও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিক প্রতিনিধি চূড়ান্ত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাতে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম চূড়ান্ত হওয়ার পরদিনই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনো অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ করা হয়নি।
নতুন মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের পাশাপাশি মালিকপক্ষের বক্তব্য এবং শিল্পের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষ করে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বার্থ বেশি সংরক্ষিত হয়, সে চেষ্টা করবে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে শিল্পবান্ধব ও শ্রমিকবান্ধব নীতি অনুসরণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।
শ্রমিকদের দাবি আদায়ের অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দাবি জানানোর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়া এবং আলোচনার সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।
তিনি জানান, মজুরি বোর্ডসহ বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রমিকেরা তাঁদের দাবি তুলে ধরতে পারবেন।
আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে সরানোর ক্ষেত্রেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আলোচনা ও সমঝোতার পথ অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সড়কে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, এসব ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে শ্রমিকদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণ সম্পর্কে ওই বক্তব্যে নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের প্রসঙ্গেও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি জানান, তাঁদের আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মুক্তির বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে।
এ ছাড়া আন্দোলন ও সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিদের বিষয়ে যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তবে গ্রেফতার ব্যক্তিদের সবাইকে মুক্তি দেওয়ার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
পোশাকশিল্পের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষকে সহযোগিতার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শ্রমিকের শ্রম ও মালিকের বিনিয়োগের সমন্বয়ে শিল্প খাত পরিচালিত হয়। দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের জন্য শিল্পের উৎপাদন অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বেকারত্ব যাতে না বাড়ে, সে জন্য মিল-কারখানা সচল রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
শ্রমিকনেতাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁরা যেন শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান। নতুন মজুরি বোর্ডে শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধি থাকায় দাবি নিয়ে আলোচনার সুযোগ রয়েছে।
এর আগে সোমবার সকাল সাড়ে ৯টায় তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
ওই বৈঠকে শ্রমমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শ্রমিকনেতা ও সংসদ সদস্য শিমুল বিশ্বাস, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা এবং পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্যসমূহ