রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের (চার্জ গঠন) শুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
রোববার (১ নভেম্বর ২০২৬) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট দুটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগের ওপর আজ রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন করবে। এর আগে গত ৭ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের শুনানির তারিখ ধার্য থাকলেও আসামিপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা পিছিয়ে আজকের দিন নির্ধারণ করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া ১১ জন আসামির মধ্যে সকালে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাংবাদিক ফারজানা রুপাসহ ৯ জনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্য দুই আসামির মধ্যে অসুস্থতার কারণে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হককে ট্রাইব্যুনালে আনা সম্ভব হয়নি এবং নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনার কারণে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ভার্চুয়ালি হাজিরার মাধ্যমে শুনানিতে যুক্ত হচ্ছেন।
মামলার প্রধান অভিযুক্ত শেখ হাসিনাসহ অবশিষ্ট ৩০ জন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুবউল আলম হানিফ, ড. হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ডা. ইমরান এইচ সরকার, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও বেনজীর আহমেদ, র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান এবং সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম ও সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা।
এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৩০ আসামিকে নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে জাতীয় দৈনিকে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের কোনো হদিস না পেয়ে এবং তারা আত্মসমর্পণ না করায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে পলাতক ঘোষণা করেন এবং বিচার কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে তাঁদের পক্ষে সরকারি খরচে আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স কাউন্সিল) নিয়োগের নির্দেশ দেন। গত ২৭ জুলাই ট্রাইব্যুনাল-২ প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রটি আমলে নিয়েছিলেন।
প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে মূলত দুটি পৃথক গণহত্যার ধারা যুক্ত করা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে অভিযান চলাকালে ৩২ জনকে সরাসরি গুলি চালিয়ে হত্যার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে পরদিন অর্থাৎ ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদী জনতার ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর দমনপীড়নে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের আইনি দায় নির্ধারণেই আজ ট্রাইব্যুনালে শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মন্তব্যসমূহ