পোল্যান্ডের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের (আদালত) প্রধানকে সাময়িক বরখাস্তের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম সাংবিধানিক সংকট ও তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ইস্যুতে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন ইউরোপপন্থি প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক এবং জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করে সরকার বিচার বিভাগীয় সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে অনড় রয়েছে; অন্যদিকে দেশটির বিরোধী পক্ষ সরকারের এ পদক্ষেপকে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান দখলের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ‘অভ্যুত্থান’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর ২০২৬) টানা দ্বিতীয় রাতের মতো রাজধানী ওয়ারশতে সাংবিধানিক আদালত ভবনের বাইরে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আদালত প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশে বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগে শুক্রবার রাতে আদালতের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা ও পুলিশের দিকে বস্তু নিক্ষেপের অভিযোগে তিন বিক্ষোভকারীকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের প্রশাসনের দাবি, বিগত সরকারের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করতে আদালতের প্রধান বগদান শভিয়েনতকোভস্কিকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা অপরিহার্য ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রধানমন্ত্রী টাস্ক উল্লেখ করেন, আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। পিআইএসের শাসনামলে বছরের পর বছর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিচারব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় ফেরানো একটি কঠিন ও বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া হলেও এর কোনো বিকল্প নেই।
অন্যদিকে সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে দৃশ্যপটে এসেছেন প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেনেগাল সফরের উদ্দেশে রওনা দিয়েও আকাশপথে মাঝপথ থেকে নিজের বিমান ঘুরিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফেরেন তিনি। দেশে নেমেই তিনি সরাসরি সাংবিধানিক আদালতে উপস্থিত হন এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে বরখাস্ত হওয়া প্রধান বিচারপতিকে আদালত ভবনে প্রবেশের ব্যবস্থা করে দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাংবিধানিক আদালতকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত আগামী বছরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পোল্যান্ডের রাজনৈতিক মেরুকরণকে চরম রূপ দেবে। এতে ডোনাল্ড টাস্কের ক্ষমতাসীন জোট এবং সাবেক ক্ষমতাসীন ডানপন্থি দল আইন ও বিচার পার্টির (পিআইএস) মধ্যকার দ্বন্দ্ব আরও সংঘাতময় হতে পারে। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পিআইএসের শাসনামলে বিচারব্যবস্থায় আনা পরিবর্তনের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গভীর আপত্তি জানিয়ে পোল্যান্ডের ওপর আর্থিক জরিমানাও আরোপ করেছিল। এমনকি ইউরোপীয় কোর্ট অব জাস্টিসও জানিয়েছিল যে, দলীয় ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়ায় পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত স্বাধীন মর্যাদা হারিয়েছে। ২০২৩ সালে টাস্ক ক্ষমতায় এলেও পিআইএস-ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রপতির ভেটো ক্ষমতার কারণে এসব সংস্কার বারবার আইনি অচলাবস্থায় পড়ছে।
মন্তব্যসমূহ