ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে একযোগে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। বৃহস্পতিবারের এসব হামলায় অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাটি হয়েছে দিনিপ্রো শহরের একটি ব্যস্ত রেলস্টেশনে। সেখানে ড্রোনের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪ জন। এ ছাড়া চেরনিহিভ, ক্রেমেনচুক ও রাজধানী কিয়েভেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিনিপ্রোর প্রধান রেলস্টেশনে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক সেই সময় জেট ইঞ্জিনচালিত একটি ড্রোন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আঘাত হানে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় রেল সংস্থা উক্রজালিজনিতসিয়া হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
হামলার পর স্টেশন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বিস্ফোরণের ধাতব টুকরা ও মরদেহ। মেঝেতে জমে যায় রক্ত। এ সময় বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজতে থাকলেও পুলিশ কালো ব্যাগে করে নিহতদের মরদেহ সরিয়ে নেয়। স্টেশনের ভূগর্ভস্থ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছিলেন ৬৭ বছর বয়সী স্বিতলানা শেরবাক। পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আর এসব কেন? তারা আসলে কী অর্জন করতে চাইছে? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
দিনিপ্রোতে আরেকটি হামলায় শিক্ষার্থীদের আবাসিক ভবনে আগুন ধরে যায়। আঞ্চলিক গভর্নর ওলেক্সান্দর হানঝা জানান, বৃহস্পতিবারের হামলায় শহরটির প্রায় তিন লাখ ৫০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
এদিকে উত্তরাঞ্চলীয় চেরনিহিভ শহরে ব্যস্ত সড়কে ড্রোন হামলায় দুই কিশোরীসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ২৩ জন। আহতদের মধ্যে চারটি শিশু রয়েছে। শহরটির সামরিক প্রশাসনের প্রধান দিমিত্রো ব্রিঝিনস্কি জানান, হামলার শিকার ব্যক্তিরা সাধারণ নাগরিক ছিলেন। তারা প্রতিদিনের মতো কাজে যাওয়ার পথে হামলার মুখে পড়েন।
মধ্য ইউক্রেনের ক্রেমেনচুক শহরে আবাসিক ভবনে রুশ হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩২ জন। আঞ্চলিক গভর্নরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হামলায় কয়েকটি ব্যক্তিগত ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে রাজধানী কিয়েভেও বৃহস্পতিবার রাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। শহরটির সামরিক প্রশাসন জানায়, রাত ১১টার কিছু আগে কয়েকটি এলাকায় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত হন। কয়েকটি গুদামে আগুন লাগার পাশাপাশি দিনিপ্রো নদীর পূর্ব তীরের একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া শহরেও তিনটি পৃথক ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। কয়েকটি বাসে ড্রোনের আঘাতে ছয়জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।
হামলার ধারাবাহিকতায় ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেৎস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে বেসামরিক মানুষকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ তুলেছেন। টেলিগ্রামে দেওয়া বার্তায় তিনি বলেন, রাশিয়া ট্রেন, রেলস্টেশন ও আবাসিক ভবনে হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলার কোনো যুক্তি নেই এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পক্ষে কোনো ব্যাখ্যাও থাকতে পারে না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও রাশিয়ার সর্বশেষ হামলাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সবাই যখন উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগের অপেক্ষায়, তখনই রাশিয়া হামলা চালাচ্ছে। এটি ইচ্ছাকৃত।
জেলেনস্কি আরো জানান, রাশিয়া নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে ইউক্রেনের গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন। রুশ হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি এ বিষয়ে মিত্রদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
এদিকে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন এলাকায় ছয় দিনের স্থানীয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় নেওয়া এই উদ্যোগের আওতায় রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ওলেশকি শহরে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর থেকে শহরটি যুদ্ধের মধ্যে আটকে রয়েছে।
ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয় পক্ষই জানিয়েছে, ওই এলাকায় মাইন অপসারণের কাজ শেষ হয়েছে। ফলে এখন শহরটিতে ত্রাণ পাঠানো এবং সেখান থেকে চলে যেতে ইচ্ছুক বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তবে খেরসনে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইউক্রেনের অন্যান্য অঞ্চলে রুশ হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে রেলপথ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট থাকায় রাশিয়া সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে হামলার মাত্রা বাড়াচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। আগামী মাসে ইউক্রেন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন জেলেনস্কির শীর্ষ উপদেষ্টা কিরিলো বুদানভসহ ইউক্রেনের কর্মকর্তারা।
তাদের মতে, চলমান হামলা বন্ধ করতে রাশিয়ার ওপর মিত্র দেশগুলোর চাপ আরো জোরালো করা প্রয়োজন। তবে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনা নিয়ে আশার পরিবেশ তৈরি হলেও ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে হামলা সেই সম্ভাবনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে।
সূত্র: রয়টার্স।
মন্তব্যসমূহ