ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ (নেসেট) নির্বাচনের ভোট গণনা অব্যাহত থাকার মধ্যেই গভীর রাতে লিকুদ পার্টির নির্বাচনী সদর দপ্তরে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া এক বিজয়োচিত বক্তব্যে একটি ‘শক্তিশালী ডানপন্থী জাতীয় সরকার’ গঠনের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক সাফল্য তুলে ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানের ওপর নতুন করে সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং দেশটির কথিত অস্তিত্বগত হুমকি চিরতরে দূর করার উন্মুক্ত ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর ২০২৬) দিবাগত রাত ৩টার পর জেরুজালেমে দেওয়া এ ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ইসরায়েলের সামনে এক অনন্য ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। তিনি সমর্থকদের আশ্বস্ত করেন, কোনো রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক চাপই তাঁদের এই লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। টেক্সাসে এক নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পও দাবি করেন, তাঁর প্রকাশ্য সমর্থন নেতানিয়াহুকে বড় বিপর্যয় থেকে ফিরিয়ে আনতে નિર્ણায়ক ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে প্রাথমিক ভোট গণনার ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী শিবিরের নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট সর্বোচ্চ ৪৯টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে দেশটির মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ প্রতিনিধিত্বকারী আরব নাগরিকদের দলগুলো রেকর্ড ১৭টি আসন নিশ্চিত করার পথে রয়েছে। সামগ্রিক এই চিত্র ইসরায়েলের রাজনীতিতে গভীর অচলাবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও আইজেনকোট দাবি করেছেন নেতানিয়াহু জনগণের সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট হারিয়েছেন এবং তাঁর রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত, তবে আইজেনকোটের নিজের পক্ষেও এককভাবে সরকার গঠনের সুযোগ নেই।
ইসরায়েলের মূলধারার ইহুদি রাজনৈতিক দল ও নেতাদের কাছে সরকার গঠনে আরব দলগুলোর প্রত্যক্ষ সমর্থন নেওয়ার বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও অধিকাংশের ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য। ফলে আইজেনকোট চাইলেও সহজে আরব দলগুলোকে নিয়ে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারছেন না। অন্যদিক নেতানিয়াহু সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় নতুন সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবেন।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মঙ্গলবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশে, যা বিগত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড। কট্টর ইহুদি জাতীয়তাবাদ, ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে বসতি সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি উপেক্ষা করার নীতির কারণে ইসরায়েলের রাজনীতিতে ডানপন্থী শক্তির ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়েছে। বিপরীতে ঐতিহাসিকভাবে শান্তি আলোচনা ও সমঝোতায় বিশ্বাসী মধ্য-বামপন্থী দলগুলো কার্যত প্রান্তিক শক্তিতে রূপ নিয়েছে।
একই সময়ে নেতানিয়াহুর উগ্র জাতিগত নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের রেকর্ডসংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। জয়েন্ট লিস্টের সদর দপ্তরে বিজয়োল্লাসের মাঝে দলটির প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা দখলদারত্ব ও বর্ণবাদ মেনে নেবেন না। সব মিলিয়ে ইসরায়েলে সরকার গঠনের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ এখন জটিল জোট আলোচনা এবং আরব দলগুলোর কৌশলগত ভূমিকার ওপরই ঝুলছে।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ