নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়ে সরকারের অটল ও দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতেই হবে এবং এর কোনো বিকল্প নেই। তবে এই সরকারের সুনির্দিষ্ট গঠনপ্রক্রিয়া, সাংবিধানিক ক্ষমতা, কার্যপরিধি এবং মেয়াদকাল নির্ধারণের বিষয়ে এখনো বিস্তারিত পর্যালোচনা চলছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর ২০২৬) জাতীয় সংসদের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ আলোচনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার কত দিনের মধ্যে নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হবে এবং তাদের এখতিয়ার কতটা থাকবে—তা নিয়ে কমিটির সদস্যরা আলোচনা করেছেন। ভবিষ্যতে যাতে সরকার গঠন ঘিরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংকট বা সাংবিধানিক বিতর্ক সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যে বিভিন্ন বিকল্প যাচাই করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন সার্চ বডি (অনুসন্ধান কমিটি) গঠন কিংবা নির্বাচন কমিশনকে সম্পৃক্ত করার মতো প্রস্তাবগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, কমিটি সব সুপারিশ চূড়ান্ত করার পর তা বিল আকারে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবে, যেখানে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে আরও নতুন প্রস্তাব যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
সংবিধান পর্যালোচনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’-এর মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে আলোচিত ‘র্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং’ (Ranked Choice Voting) পদ্ধতির প্রস্তাবে কমিটির পক্ষ থেকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দেওয়া হয়েছে। কমিটির সদস্যদের অভিমত, নির্বাচনী ভোটগ্রহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তনের বিষয়ে জাতীয় সংসদে বিস্তারিত বিতর্কের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
এদিকে বৈঠকে অতীতে বিচারবহির্ভূত বলপ্রয়োগ ও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে নিজেদের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, হুমাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান এবং মোছা. তাহসিনা রুশদী অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতা ও দীর্ঘ আইনি বঞ্চনার বিবরণ দেন। তাঁরা জোর দাবি জানান, ভবিষ্যতে যেন কোনো নাগরিক এমন নিপীড়নের শিকার না হন, সেজন্য সংবিধানে কার্যকর আইনি সুরক্ষাব্যবস্থা ও সুস্পষ্ট প্রতিরোধমূলক ধারা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
কমিটির সভাপতি আরও জানান, সুশীল সমাজ, আইন বিশেষজ্ঞ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের কাছ থেকে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিপুলসংখ্যক লিখিত প্রস্তাব জমা পড়েছে। পরবর্তী বৈঠকগুলোতে এসব প্রস্তাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও জনআকাঙ্ক্ষার সংবিধান সংশোধনী চূড়ান্ত করা হবে।
মন্তব্যসমূহ