গাড়ি উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, দ্রুতগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ—এই পাঁচ খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সরকারি সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের রাজধানী টোকিওতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সদর দপ্তরে আয়োজিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের ঘোষণাপর্বের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, ফোরামে মোট ১৭টি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ সময় সমঝোতা স্মারকও বিনিময় করা হয়।
জেট্রো এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন যৌথভাবে ফোরামের আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে টোকিওতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস।
ফোরামে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের গাড়ি উৎপাদন শিল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশে যানবাহন উৎপাদন সম্প্রসারণে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারেক রহমান।
তিনি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি অবকাঠামো, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা আরও উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে একটি বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রস্তাবিত প্রযুক্তি পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের মতো খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পাশাপাশি মহাকাশ প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট গবেষণায় জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণ কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ।
তবে প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার নির্দিষ্ট স্থান বা বাস্তবায়নের সময়সীমা অনুষ্ঠানের সরবরাহকৃত বিবরণে উল্লেখ করা হয়নি।
বাংলাদেশের পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তারেক রহমান।
প্রস্তাবিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালকে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ধরনের রেল যোগাযোগ গড়ে তুলতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও কারিগরি সহযোগিতা চান তিনি।
একই সঙ্গে লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নেও জাপানি অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
তবে দ্রুতগতির রেল প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে—এমন ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এটি সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগ।
পাঁচ অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণকেও গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এই খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ব্যবসার পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ কারণে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো, কর ও শুল্ক ব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং ব্যবসাসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকার সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চায় বলে জানান তারেক রহমান।
অর্থনৈতিক ফোরামের ঘোষণাপর্বের সরবরাহকৃত ট্রান্সক্রিপ্ট অনুযায়ী, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা সম্পর্কিত মোট ১৭টি প্রকল্পের কথা জানানো হয়।
এ পর্বে টয়োটা তসুশো করপোরেশন, মিৎসুই অ্যান্ড কো. এবং কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি জাপানি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে সমঝোতা স্মারক বিনিময়ের বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।
তবে ১৭টি প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ নাম, প্রতিটির বিনিয়োগের পরিমাণ এবং বাস্তবায়নের সময়সূচি সরবরাহকৃত বিবরণে নেই।
ফলে এসব প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়াকে সব বিনিয়োগ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে বা অর্থ ছাড় হয়েছে—এমন অর্থে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী, ফোরামে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা।
অতিথি বক্তা হিসেবে ছিলেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক পার্লামেন্টারি ভাইস-মিনিস্টার শিনজি ওয়াকায়ামা।
ব্যবসায়িক অধিবেশনে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থাপনার বিষয় ছিল বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা।
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বিনিয়োগ সহজ করতে সংস্কার এবং নতুন উদ্যোগের বিষয়গুলো তুলে ধরার জন্য নির্ধারিত ছিলেন।
জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে মিৎসুই অ্যান্ড কো. (এশিয়া প্যাসিফিক)-এর ঢাকা শাখার ব্রাঞ্চ জেনারেল ম্যানেজার ও কান্ট্রি চেয়ারপারসন কেনইচিরো কাওয়ামোতোর উপস্থাপনার বিষয় ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ।
ওয়াইকেকে করপোরেশনের গ্লোবাল সেলস হেডকোয়ার্টার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানির উপস্থাপনায় বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয় নির্ধারিত ছিল।
এ ছাড়া ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের উপস্থাপনার বিষয় ছিল বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় উদীয়মান ব্যবসা।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন জেট্রোর ঢাকা কার্যালয়ের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুআকি কাতাওকা।
এই অর্থনৈতিক ফোরামের মাধ্যমে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
মন্তব্যসমূহ