টানা সাত দিন ধরে সড়ক অবরোধ চলায় দেশের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রাঙামাটির পর্যটনকেন্দ্র সাজেক। পাঁচ দফা দাবি আদায়ে আন্দোলনকারীরা অনড় থাকায় বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল থেকেও সাজেকের প্রধান সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে গত ২২ অক্টোবর থেকে চলা এই অবরোধ বুধবার সপ্তম দিনে গড়িয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দিনের শুরু থেকেই সাজেকের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। কয়েকটি স্থানে সড়কে গাছের গুঁড়ি রেখে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়।
তবে বুধবারের অবরোধকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
বুধবার সাজেকের উজোবাজারে সাপ্তাহিক হাট বসার দিন থাকলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় লোকসমাগম ছিল অনেক কম।
অবরোধের কারণে দূরবর্তী এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা বাজারে পৌঁছাতে পারেননি। একইভাবে নিয়মিত পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাজারের কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
টানা এক সপ্তাহ ধরে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের খাদ্যপণ্য সংগ্রহে আরও সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
সাজেকের পর্যটননির্ভর ব্যবসাগুলোও চলমান অবরোধের প্রভাব মোকাবিলা করছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি তাদের ফেসবুক পেজে জানিয়েছে, সপ্তম দিনেও পর্যটন সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
তবে কয়েক ধরনের জরুরি যানবাহনকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সংগঠনটির ঘোষণা অনুযায়ী, রোগীবাহী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, সাংবাদিকদের যানবাহন এবং ধর্মীয় কাজে নিয়োজিত ভিক্ষুদের বহনকারী যানবাহন অবরোধের আওতার বাইরে রয়েছে।
একই সঙ্গে জরুরি সেবার যানবাহন চলাচলে বাধা না দেওয়ার কথাও জানিয়েছে আন্দোলনকারীরা।
তবে পাঁচ দফা দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হবে না বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, অবরোধের কারণে সাজেক সড়কে সাধারণ যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
তবে দু-একটি মোটরসাইকেল চলাচলের খবর পাওয়া গেছে।
ওসির ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের পর্যবেক্ষণে সড়কে অবরোধকারীদের ব্যারিকেড দিতে দেখা যায়নি। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই কর্মসূচি চলছে।
এদিকে আন্দোলনকারীদের প্রকাশিত তথ্য ও স্থানীয় সূত্রে কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের কথা জানা গেছে।
অবরোধ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন পাঁচ দফা দাবিতে এই অবরোধের ডাক দিয়েছে।
দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং এলাকায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা।
পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের ওপর কথিত হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি, মামলা প্রত্যাহার, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যয় বহনের দাবিও রয়েছে।
এ ছাড়া আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ এবং তাঁদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
এসব অভিযোগ আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে উত্থাপিত। অভিযোগগুলোর সব কটির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
অবরোধের সংকট নিরসনে গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) সাজেকের উজোবাজারে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বৈঠকে আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতা হয় বলে জানান ওয়াদুদ ভূঁইয়া।
তবে সাজেক থেকে জেএসএসের সন্তু লারমা পক্ষের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আন্দোলনকারীরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ওই সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন। প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত হতে না পারায় বৈঠক শেষ হয় কোনো চূড়ান্ত সমাধান ছাড়াই।
ফলে অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা আসেনি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাকি দাবি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, অবশিষ্ট বিষয়টির সমাধানে আবারও আলোচনা করা হবে।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, দাবির পূর্ণ বাস্তবায়ন ছাড়া তাঁরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করবেন না।
ফলে বুধবারও সাজেকের সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়নি।
দীর্ঘদিন যোগাযোগ বন্ধ থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি, বাজারে পণ্য সরবরাহের সমস্যা এবং পর্যটননির্ভর ব্যবসার ক্ষতি আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মন্তব্যসমূহ