রক্তে অতিরিক্ত শর্করার কারণে মানবদেহের বিভিন্ন সংবেদনশীল অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার মধ্যে পায়ের জটিলতা অন্যতম। চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক অবস্থায় ডায়াবেটিসজনিত পায়ের সমস্যাগুলো প্রায়ই অবহেলিত থেকে যায়। তবে ছোটখাটো একটি ফোসকা, সামান্য কাটাছেঁড়া বা শুষ্ক ত্বকও পরবর্তী সময়ে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, স্নায়ুর ক্ষতি (নিউরোপ্যাথি) এবং রক্ত সঞ্চালন কমে যাওয়ার কারণে মারাত্মক ক্ষতে (ডায়াবেটিক ফুট আলসার) রূপ নিতে পারে।
ডায়াবেটিসে পায়ের যত্ন ও সুরক্ষা. Source: CDC
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পায়ে নিচের পাঁচটি লক্ষণ দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য:
১. ঝিনঝিন করা, অবশ ভাব বা জ্বালাপোড়া:
পায়ে নিয়মিত অবশ ভাব, সার্বক্ষণিক জ্বালাপোড়া বা স্পর্শের অনুভূতি কমে যাওয়া ডায়াবেটিক পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। এ অবস্থায় পায়ের সংবেদনশীল স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে আঘাত লাগলে, কেটে গেলে বা জুতার ঘর্ষণে ফোস্কা পড়লেও রোগী ব্যথা টের পান না, যা অজান্তেই বড় ক্ষত তৈরি করে।
২. ক্ষত বা ফোসকা না শুকানো:
রক্তে উচ্চ মাত্রার শর্করা শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও কোষের পুনর্গঠন ব্যাহত করে। পায়ের কোনো সাধারণ কাটাছেঁড়া দীর্ঘদিন ধরে না শুকানো, ক্ষতের আকার বৃদ্ধি পাওয়া কিংবা পুঁজ জমার মতো সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে অবিলম্বে বিশেষায়িত ড্রেসিং ও চিকিৎসার আওতায় আসতে হবে।
৩. ত্বকের রঙ ও তাপমাত্রার পরিবর্তন:
একটি পায়ের ত্বক অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে, নীলচে বা কালচে হয়ে যাওয়া এবং অন্য পায়ের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা থাকা মূলত রক্তনালির সংকোচন বা রক্ত চলাচলে বাধার ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে ত্বক অতিরিক্ত লালচে ও অস্বাভাবিক গরম হয়ে উঠলে তা গভীর প্রদাহ বা সেলুলাইটিসের মতো সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে।
৪. পা ফুলে যাওয়া বা আকৃতি বিকৃতি (চারকো ফুট):
কোনো তীব্র ব্যথা ছাড়াই হঠাৎ পা ফুলে যাওয়া, পায়ের পাতা বা গোড়ালির স্বাভাবিক গঠন বদলে যাওয়া এবং পরিচিত জুতা পরতে কষ্ট হওয়া ‘চারকো ফুট’ (Charcot Foot)-এর মারাত্মক লক্ষণ হতে পারে। এ রোগে স্নায়ু অকেজো হওয়ার কারণে পায়ের হাড় ও জয়েন্ট দুর্বল হয়ে ধসে পড়ে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে স্থায়ী পঙ্গুত্ব দেখা দিতে পারে।
৫. ত্বক ফাটা, নখ মোটা হওয়া ও ছত্রাক সংক্রমণ:
পায়ের ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে ফেটে গেলে সেই ফাঁক দিয়ে সহজে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করে। এ ছাড়া আঙুলের ফাঁকে চুলকানি, ছত্রাকের সংক্রমণ বা নখ অতিরিক্ত মোটা ও ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার লক্ষণও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, নিজে নিজে ব্লেড বা কাঁচি দিয়ে পায়ের কড়া বা শক্ত চামড়া কাটা মারাত্মক বিপজ্জনক হতে পারে।
দৈনন্দিন যত্নের নিয়মাবলী:
গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ডায়াবেটিস রোগীদের প্রতিদিন অন্তত একবার আয়না ব্যবহার করে অথবা পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় পায়ের তলা, গোড়ালি ও আঙুলের ফাঁক পরীক্ষা করা উচিত। পা সব সময় পরিষ্কার ও শুকনা রাখা, সঠিক মাপের আরামদায়ক জুতা ও সুতি মোজা পরা এবং ঘরের ভেতরেও খালি পায়ে হাঁটা পরিহার করা প্রয়োজন। কোনো আপাত সমস্যা না থাকলেও অন্তত বছরে একবার চিকিৎসকের কাছে পা পরীক্ষা করানো কার্যকর ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনার অন্যতম শর্ত।
মন্তব্যসমূহ