অগ্ন্যাশয়ের মারাত্মক ক্যানসার কোষগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও আচরণ পরিবর্তন করে বলে সম্প্রতি এক গবেষণায় উঠে এসেছে। এই রূপান্তরের কারণেই কোনো কোনো কোষ প্রচলিত চিকিৎসা ও ওষুধের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে, আবার কিছু কোষ শরীরের অন্যান্য অঙ্গে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা অর্জন করে। প্রায় সাড়ে চার লাখ একক কোষ বিশ্লেষণ করে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান দিয়েগো (ইউসি সান দিয়েগো) মুরস ক্যানসার সেন্টার এবং নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির (এনওয়াইইউ) একদল গবেষক।
বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার জেনেটিকস’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় মূলত অগ্ন্যাশয়ের সবচেয়ে জটিল ও প্রাণঘাতী ধরন ‘প্যানক্রিয়াটিক ডাক্টাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা’ (পিডিএসি) নিয়ে কাজ করা হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্যমতে, এই জটিল ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ৮৫ শতাংশেরও বেশি রোগ শনাক্তের পাঁচ বছরের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।
গবেষক দল পিডিএসিতে আক্রান্ত ৫৯ জন রোগীর ৬২টি টিউমার থেকে সংগ্রহ করা ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৪৫১টি একক কোষের জিনগত কার্যকলাপ ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। এতে দেখা যায়, টিউমারের ভেতরে বিভিন্ন ক্লোন বা জিনগত বৈশিষ্ট্যের কোষগুচ্ছ সমান্তরালে অবস্থান করে। মুরস ক্যানসার সেন্টারের পরিচালক ও গবেষণার অন্যতম জ্যেষ্ঠ লেখক ডায়ান সিমিওন জানান, অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার অত্যন্ত আগ্রাসী হওয়ায় এর কার্যকর চিকিৎসা সীমিত। একই টিউমারের ভেতরে কোষগুলোর বৈশিষ্ট্য, রূপান্তর এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন হওয়ায় রোগটি নিরাময় করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে ওঠে।
পূর্বে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার কোষকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হতো—তুলনামূলক কম আগ্রাসী ‘ক্ল্যাসিক্যাল’ এবং অত্যন্ত আগ্রাসী ‘বেসাল’। তবে নতুন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, জিনগত পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এই কোষগুলো এক ধরন থেকে অন্য ধরনে রূপান্তরিত হতে পারে। বিশেষ করে অতি আগ্রাসী বেসাল কোষে ‘এমওয়াইসি’ (MYC) নামের একটি জিনের অতিসক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। পরীক্ষায় দেখা যায়, এমওয়াইসি জিনের কার্যকলাপ কৃত্রিমভাবে বাধাগ্রস্ত করা গেলে আগ্রাসী কোষগুলো আবার কম ক্ষতিকর ক্ল্যাসিক্যাল বৈশিষ্ট্যে ফিরে আসে, যা শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে পুনরায় সক্রিয় করে তোলে।
এ ছাড়া গবেষণায় জানা গেছে, কিছু কোষগুচ্ছে ‘টিআইজিআইটি’ (TIGIT) জিনের উপস্থিতি বেশি থাকায় সেগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে। একই সঙ্গে এসব কোষে ‘পিডি-১’ (PD-1) জিনের উপস্থিতি কম থাকায় প্রচলিত পিডি-১ কেন্দ্রিক আধুনিক ইমিউনোথেরাপিগুলো কেন অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে ব্যর্থ হয়, তার একটি স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। গবেষকরা মনে করছেন, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের লক্ষ্যভিত্তিক (টার্গেটেড) নতুন ওষুধ ও সফল চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
মন্তব্যসমূহ