ঢাকা    মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

এক মন্তব্যেই চীনে বড় ধাক্কা খেলেন এমবাপ্পে, হারাচ্ছেন স্পনসর

এক মন্তব্যেই চীনে বড় ধাক্কা খেলেন এমবাপ্পে, হারাচ্ছেন স্পনসর
ছবি : সংগৃহিত
ফলো করুন

চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংকে নিয়ে কথিত মন্তব্যের জেরে বড় ধরনের বিতর্কে জড়িয়েছেন ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ঘিরে চীনে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে দেশটির কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরাসি একটি টকশোতে এমবাপ্পের কথিত মন্তব্যের ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর বিতর্কের সূত্রপাত হয়। যদিও ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ফ্রান্সের টকশো ‘দ্য ব্রিজ’-এ নিজের পছন্দের ইন্টারনেট মিম নিয়ে কথা বলছেন এমবাপ্পে। এ সময় তিনি এমন একটি মিমের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তাঁর মুখ একজন চীনা নেতার ছবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ভিডিও অনুযায়ী, এমবাপ্পে বলেন, যে মিমটি দেখে তিনি সবচেয়ে বেশি হাসেন, সেটি এমন একজন ব্যক্তির ভিডিও, যাঁকে তিনি সম্ভবত একজন চীনা স্বৈরশাসক বলে মনে করেন।

ওই সময় পর্দায় এমন একটি ছবি দেখানো হয়, যা চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংয়ের ছবির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ছবিটিতে এমবাপ্পের মুখ বসানো ছিল।

ভিডিওতে এমবাপ্পেকে আরও বলতে শোনা যায়, বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত এই মিম ব্যবহার করেন তিনি।

তবে এমবাপ্পে তাঁর বক্তব্যে সরাসরি মাও সেতুংয়ের নাম উল্লেখ করেননি। টকশোটির মূল ভিডিও বর্তমানে ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ক্লিপের সত্যতা পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিতর্কের পর এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীনের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান।

দেশটির বৃহত্তম দুগ্ধপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ জানিয়েছে, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তাদের অবস্থান কঠোর।

এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন যেকোনো বক্তব্য বা আচরণের বিরুদ্ধে তারা দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে এবং এ বিষয়ে তাদের নীতি শূন্য সহনশীলতার।

চীনের পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডংপেংও একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো আচরণ তারা সমর্থন করে না এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তাদের কোনো সহনশীলতা নেই।

তবে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরাসরি বিতর্কিত ভিডিওটির উল্লেখ করেনি।

এ কারণে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, এমবাপ্পে ঠিক কোন বক্তব্য বা আচরণের মাধ্যমে চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছেন।

এমবাপ্পেকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান।

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো তাঁদের নজরে এসেছে। চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন বক্তব্য ও আচরণের বিরুদ্ধে দেশটির সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবাদ আসবে।

চীনা ফুটবলভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ডংকিউদি সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে এমবাপ্পের কথিত মন্তব্যকে অনুপযুক্ত হিসেবে বর্ণনা করে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ওই বক্তব্য চীন ও চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে।

ডংকিউদি আরও জানায়, বক্তব্যটি চীন ও দেশটির জনগণের জন্য অবমাননাকর হওয়ায় তারা সেটি অনুবাদ করতে পারছে না।

বিতর্কের প্রভাব শুধু বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্যিক চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

চীনা সংবাদমাধ্যম দ্য পেপারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি স্পেনের শীর্ষ ফুটবল লিগ লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করছে।

অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, সিসিটিভির সংবাদভিত্তিক অ্যাপগুলোতে ফরাসি এই ফুটবল তারকাকে নিয়ে আর কোনো কনটেন্ট দেখা যাচ্ছে না।

এমবাপ্পে চীনে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকা। দেশটির বাজারে তাঁর উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক উপস্থিতি রয়েছে এবং বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ার পর চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সমালোচনা শুরু হয়।

কিছু ব্যবহারকারীর অভিযোগ, এমবাপ্পে চীনের বাজার থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অথচ দেশটির জনগণের কাছে আপত্তিকর মনে হতে পারে এমন মন্তব্য করছেন।

চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, বিশেষ করে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল ও সংবেদনশীল আচরণ করা উচিত। কারণ জাতীয় অনুভূতিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

মাও সেতুং ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকজুড়ে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।

তাঁর শাসনামলে দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্যে নেওয়া ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির পর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত বহু মানুষ নিপীড়নের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে বুদ্ধিজীবী, জমির মালিক, শিল্পী এবং কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও ছিলেন।

১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর চীনে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুগের সূচনা হয়। দেশটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে শুরু করে।

তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর শাসনব্যবস্থা থেকে চীন অনেক ক্ষেত্রে সরে এলেও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি মাও সেতুংকে জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মান জানিয়ে আসছে।

ফুটবলবিশ্বে এমবাপ্পেকে ঘিরে ‘স্বৈরশাসক’ শব্দটি ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মিম তৈরি হচ্ছে।

ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের কার্যক্রমে তাঁর প্রভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অনেক ফুটবল সমর্থক তাঁকে রসিকতা করে ‘দ্য ডিক্টেটর’ বলে ডাকেন।

২০২৪ সালে ফ্রান্সের এক ইনফ্লুয়েন্সার ও কাবাবের দোকানের মালিক তাঁর একটি স্যান্ডউইচের বর্ণনায় এমবাপ্পের নাম ব্যবহার করলে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন ফুটবল তারকা।

ঘটনাটি তাঁর কথিত ‘স্বৈরশাসক’ ভাবমূর্তিকে আরও জোরালো করেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে ফ্রান্স জাতীয় দলের সতীর্থ উসমান দেম্বেলে মজা করে তাঁকে ‘মবুতু’ নামে ডাকেন।

এই নামটি ছিল কঙ্গোর সাবেক স্বৈরশাসক মবুতু সেসে সেকোর প্রতি ইঙ্গিত। তিনি সাবেক জায়ার, বর্তমানে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, তিন দশক ধরে শাসন করেছিলেন।

গত সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স ফুটবলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে নিজের নামে তৈরি এসব মিম নিয়ে কথা বলেছিলেন।

তিনি স্বীকার করেন, অনেক মিমের পেছনে নিছক হাস্যরস থাকলেও কখনো কখনো সেগুলো রাজনৈতিক ও মানবিক সচেতনতার অভাব প্রকাশ করে।

এমবাপ্পে তখন বলেছিলেন, ইতিহাসে যাঁরা অসংখ্য মানুষের ক্ষতি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি সব সময় হাস্যকর নয়।

যেসব ব্যক্তি মানুষ হত্যা করেছেন কিংবা লাখ লাখ মানুষের দুর্দশার কারণ হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে নিজের তুলনা হওয়াকে তিনি অস্বস্তিকর বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

চীনে বিতর্ক বাড়লেও এমবাপ্পে কিংবা ‘দ্য ব্রিজ’ টকশোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিতর্কিত সাক্ষাৎকারটি ঠিক কবে প্রচারিত হয়েছিল, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফলে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং এমবাপ্পের বক্তব্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

তবে ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও চীনে এর প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে এমবাপ্পের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ফুটবল সম্প্রচারে প্রভাব ফেলেছে।

সূত্র: বিবিসি নিউজ।

ট্যাগ : চীন কিলিয়ান এমবাপ্পে

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬


এক মন্তব্যেই চীনে বড় ধাক্কা খেলেন এমবাপ্পে, হারাচ্ছেন স্পনসর

প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংকে নিয়ে কথিত মন্তব্যের জেরে বড় ধরনের বিতর্কে জড়িয়েছেন ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ঘিরে চীনে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ডের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে দেশটির কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরাসি একটি টকশোতে এমবাপ্পের কথিত মন্তব্যের ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর বিতর্কের সূত্রপাত হয়। যদিও ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ফ্রান্সের টকশো ‘দ্য ব্রিজ’-এ নিজের পছন্দের ইন্টারনেট মিম নিয়ে কথা বলছেন এমবাপ্পে। এ সময় তিনি এমন একটি মিমের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে তাঁর মুখ একজন চীনা নেতার ছবির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ভিডিও অনুযায়ী, এমবাপ্পে বলেন, যে মিমটি দেখে তিনি সবচেয়ে বেশি হাসেন, সেটি এমন একজন ব্যক্তির ভিডিও, যাঁকে তিনি সম্ভবত একজন চীনা স্বৈরশাসক বলে মনে করেন।

ওই সময় পর্দায় এমন একটি ছবি দেখানো হয়, যা চীনের সাবেক নেতা মাও সেতুংয়ের ছবির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ছবিটিতে এমবাপ্পের মুখ বসানো ছিল।

ভিডিওতে এমবাপ্পেকে আরও বলতে শোনা যায়, বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত এই মিম ব্যবহার করেন তিনি।

তবে এমবাপ্পে তাঁর বক্তব্যে সরাসরি মাও সেতুংয়ের নাম উল্লেখ করেননি। টকশোটির মূল ভিডিও বর্তমানে ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ক্লিপের সত্যতা পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিতর্কের পর এমবাপ্পের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীনের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান।

দেশটির বৃহত্তম দুগ্ধপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেংনিউ জানিয়েছে, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তাদের অবস্থান কঠোর।

এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন যেকোনো বক্তব্য বা আচরণের বিরুদ্ধে তারা দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে এবং এ বিষয়ে তাদের নীতি শূন্য সহনশীলতার।

চীনের পানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডংপেংও একই ধরনের অবস্থান জানিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন কোনো আচরণ তারা সমর্থন করে না এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তাদের কোনো সহনশীলতা নেই।

তবে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরাসরি বিতর্কিত ভিডিওটির উল্লেখ করেনি।

এ কারণে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ব্যবহারকারী প্রশ্ন তুলেছেন, এমবাপ্পে ঠিক কোন বক্তব্য বা আচরণের মাধ্যমে চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছেন।

এমবাপ্পেকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান।

তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো তাঁদের নজরে এসেছে। চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে এমন বক্তব্য ও আচরণের বিরুদ্ধে দেশটির সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবাদ আসবে।

চীনা ফুটবলভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ডংকিউদি সোমবার রাতে এক বিবৃতিতে এমবাপ্পের কথিত মন্তব্যকে অনুপযুক্ত হিসেবে বর্ণনা করে।

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ওই বক্তব্য চীন ও চীনা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে।

ডংকিউদি আরও জানায়, বক্তব্যটি চীন ও দেশটির জনগণের জন্য অবমাননাকর হওয়ায় তারা সেটি অনুবাদ করতে পারছে না।

বিতর্কের প্রভাব শুধু বিজ্ঞাপন ও বাণিজ্যিক চুক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

চীনা সংবাদমাধ্যম দ্য পেপারের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি স্পেনের শীর্ষ ফুটবল লিগ লা লিগার ম্যাচ সম্প্রচার স্থগিত করছে।

অন্যদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, সিসিটিভির সংবাদভিত্তিক অ্যাপগুলোতে ফরাসি এই ফুটবল তারকাকে নিয়ে আর কোনো কনটেন্ট দেখা যাচ্ছে না।

এমবাপ্পে চীনে অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন আন্তর্জাতিক ফুটবল তারকা। দেশটির বাজারে তাঁর উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক উপস্থিতি রয়েছে এবং বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ার পর চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সমালোচনা শুরু হয়।

কিছু ব্যবহারকারীর অভিযোগ, এমবাপ্পে চীনের বাজার থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অথচ দেশটির জনগণের কাছে আপত্তিকর মনে হতে পারে এমন মন্তব্য করছেন।

চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উইবোতে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, বিশেষ করে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল ও সংবেদনশীল আচরণ করা উচিত। কারণ জাতীয় অনুভূতিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

মাও সেতুং ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকজুড়ে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।

তাঁর শাসনামলে দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্যে নেওয়া ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির পর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।

পরবর্তী সময়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় কমিউনিস্ট শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত বহু মানুষ নিপীড়নের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে বুদ্ধিজীবী, জমির মালিক, শিল্পী এবং কমিউনিস্ট পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরাও ছিলেন।

১৯৭৬ সালে মাওয়ের মৃত্যুর পর চীনে নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুগের সূচনা হয়। দেশটি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে শুরু করে।

তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর শাসনব্যবস্থা থেকে চীন অনেক ক্ষেত্রে সরে এলেও দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি মাও সেতুংকে জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মান জানিয়ে আসছে।

ফুটবলবিশ্বে এমবাপ্পেকে ঘিরে ‘স্বৈরশাসক’ শব্দটি ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মিম তৈরি হচ্ছে।

ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের কার্যক্রমে তাঁর প্রভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে অনেক ফুটবল সমর্থক তাঁকে রসিকতা করে ‘দ্য ডিক্টেটর’ বলে ডাকেন।

২০২৪ সালে ফ্রান্সের এক ইনফ্লুয়েন্সার ও কাবাবের দোকানের মালিক তাঁর একটি স্যান্ডউইচের বর্ণনায় এমবাপ্পের নাম ব্যবহার করলে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেন ফুটবল তারকা।

ঘটনাটি তাঁর কথিত ‘স্বৈরশাসক’ ভাবমূর্তিকে আরও জোরালো করেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপ চলাকালে ফ্রান্স জাতীয় দলের সতীর্থ উসমান দেম্বেলে মজা করে তাঁকে ‘মবুতু’ নামে ডাকেন।

এই নামটি ছিল কঙ্গোর সাবেক স্বৈরশাসক মবুতু সেসে সেকোর প্রতি ইঙ্গিত। তিনি সাবেক জায়ার, বর্তমানে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, তিন দশক ধরে শাসন করেছিলেন।

গত সেপ্টেম্বরে ফ্রান্স ফুটবলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমবাপ্পে নিজের নামে তৈরি এসব মিম নিয়ে কথা বলেছিলেন।

তিনি স্বীকার করেন, অনেক মিমের পেছনে নিছক হাস্যরস থাকলেও কখনো কখনো সেগুলো রাজনৈতিক ও মানবিক সচেতনতার অভাব প্রকাশ করে।

এমবাপ্পে তখন বলেছিলেন, ইতিহাসে যাঁরা অসংখ্য মানুষের ক্ষতি করেছেন, তাঁদের সঙ্গে তুলনা করার বিষয়টি সব সময় হাস্যকর নয়।

যেসব ব্যক্তি মানুষ হত্যা করেছেন কিংবা লাখ লাখ মানুষের দুর্দশার কারণ হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে নিজের তুলনা হওয়াকে তিনি অস্বস্তিকর বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

চীনে বিতর্ক বাড়লেও এমবাপ্পে কিংবা ‘দ্য ব্রিজ’ টকশোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বিতর্কিত সাক্ষাৎকারটি ঠিক কবে প্রচারিত হয়েছিল, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ফলে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং এমবাপ্পের বক্তব্যের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

তবে ভিডিওটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও চীনে এর প্রতিক্রিয়া ইতোমধ্যে এমবাপ্পের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ফুটবল সম্প্রচারে প্রভাব ফেলেছে।

সূত্র: বিবিসি নিউজ।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ