দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য, পানি ও বিদ্যুতের সংকটে থাকা ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত ওলেশকি শহরে সীমিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের ঘোষণার এক সপ্তাহ পর এই যুদ্ধবিরতি শুরু হলো। এর ফলে অবরুদ্ধ শহরটিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং আটকে পড়া বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউক্রেনের কর্মকর্তারা উভয়েই নিশ্চিত করেছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে এবং তা মেনে চলা হচ্ছে। শুক্রবার শহরটির বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে ওলেশকি। শহরটির বহু বাসিন্দা খাবারের অভাবে বাগানের আগাছা রান্না করে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই চরম ক্ষুধায় ভুগছেন এবং যত দ্রুত সম্ভব শহর ছাড়তে চান।
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলের ওলেশকি শহরটি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের প্রথম দিকেই দখল হয়ে যায়।
যুদ্ধের আগে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার। ইউক্রেনের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে শহর ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৬ হাজার মানুষ আটকা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২০০ শিশু রয়েছে।
দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
গত তিন বছর ধরে সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সরবরাহ নেই। শহরের কোনো দোকানও খোলা নেই। ফলে বাসিন্দাদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে শহরটিতে ত্রাণ পৌঁছানোর চেষ্টা করা হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।
ওলেশকির একদিকে রয়েছে দিনিপ্রো নদী, যা খেরসন অঞ্চলে যুদ্ধের সম্মুখসারির সীমানা তৈরি করেছে। নদীর অপর পারে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অবস্থান। অন্যদিকে রয়েছে রাশিয়ার সেনারা।
এ কারণে শহরটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আশপাশের সড়কগুলোতে স্থলমাইন থাকায় হেঁটে বের হওয়ার চেষ্টাও অত্যন্ত বিপজ্জনক।
গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, মেলানিয়া ট্রাম্প ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন।
তবে সেই ঘোষণায় যুদ্ধবিরতি কত দিন স্থায়ী হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় টেলিগ্রামে জানিয়েছে, মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি হিসেবে মস্কোর স্থানীয় সময় ভোর ৪টা, অর্থাৎ গ্রিনিচ মান সময় রাত ১টা থেকে দিনিপ্রো নদীর অপর পারে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা খেরসন শহরের দিকে গোলাবর্ষণ বন্ধ করেছে তারা।
অন্যদিকে ইউক্রেনের পার্লামেন্টের মানবাধিকার কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুদ্ধবিরতি শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, "As head of the Ukrainian negotiating team, I confirm that the Ukrainian side is honouring its commitments."
অর্থাৎ, ইউক্রেনের আলোচক দলের প্রধান হিসেবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে ইউক্রেন নিজেদের প্রতিশ্রুতি মেনে চলছে।
যুদ্ধবিরতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো শহরে আটকে থাকা মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় ত্রাণ সরবরাহ করা।
ওলেশকির কয়েকজন বাসিন্দা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাঁরা শহর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চান। দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য ও পানির অভাবে তাঁদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
এক নারী জানিয়েছেন, স্থলমাইনে পা দেওয়ার পর আহত হয়ে তাঁকে দুটি অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শুক্রবারের পরিকল্পিত উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তিনি।
বিবিসিকে ওই নারী বলেন, "I dont know how long I will have to spend there."
অর্থাৎ, তাঁকে হাসপাতালে আর কত দিন থাকতে হবে, তা তিনি জানেন না।
যুদ্ধবিরতির ফলে শহর ছাড়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আশা দেখা দিলেও তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি।
কিছু বাসিন্দার আশঙ্কা, রুশ কর্তৃপক্ষ তাঁদের ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ফিরে যেতে বাধা দিতে পারে।
এ ছাড়া তাঁদের মুঠোফোন ও অনলাইন কার্যক্রম পরীক্ষা করে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের প্রমাণ খোঁজা হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আটক ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয় করছেন তাঁরা।
তবে এসব আশঙ্কা সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে সামনে এসেছে। পরিকল্পিত উদ্ধার কার্যক্রমে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
গত সপ্তাহে মেলানিয়া ট্রাম্পের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে ওলেশকির বাসিন্দাদের প্রয়োজন নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাশিয়া ও ইউক্রেনের বেসামরিক প্রতিনিধিরা যৌথভাবে শহরের বাসিন্দাদের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন।
এর মাধ্যমে কার কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
যুদ্ধবিরতির সময় খাদ্য ও জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও চালানোর কথা রয়েছে।
তবে কতজনকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে এবং কোন পথে তাঁদের নিরাপদ স্থানে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প সাধারণত হোয়াইট হাউসের প্রকাশ্য কার্যক্রমে তুলনামূলক কম উপস্থিত থাকলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নিয়েছেন।
বিশেষ করে যুদ্ধের প্রভাবে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি তাঁর কার্যক্রমে গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৫ সালের আগস্টে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে একটি চিঠি লিখেছিলেন তিনি।
সেই চিঠিতে বিশ্বজুড়ে শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন মেলানিয়া ট্রাম্প।
এবার তাঁর ঘোষণার পর ওলেশকিতে সীমিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ায় শহরটির অসহায় মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতি কত দিন কার্যকর থাকবে এবং শুক্রবারের পরিকল্পিত উদ্ধার কার্যক্রম কতটা সফল হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সূত্র: বিবিসি নিউজ।
মন্তব্যসমূহ