জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির তীব্র মূল্যস্ফীতির ক্ষোভ রূপ নিয়েছে ব্যাপক নগর বিদ্রোহে। দাঙ্গা, লুটপাট, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং লাগামহীন ঋণের বোঝার এক সর্বনাশা বিষাক্ত চক্রে বন্দি হয়ে পড়েছে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ফ্রান্স। দেশটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার খোলামেলাভাবে স্বীকার করেছেন, “আমাদের সামনে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।” তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই স্বীকারোক্তিও মাঠপর্যায়ের বাস্তব সংকট ও সংকীর্ণতার ভয়াবহতা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারছে না।
এই গভীর সংকটের মুখেও দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে কোনো কার্যকর ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা জানালেও কোনো বাস্তবসম্মত রূপরেখা দেননি; বরং ভাষণ শেষ করেই তিন দিনের সফরে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। অন্যদিকে কট্টর বামপন্থি নেতা জঁ-লুক মেলেশোঁ পুলিশি ব্যবস্থার সমালোচনা করে সরকারকে দোষারোপ করছেন, আর নির্বাচনে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দলের নেত্রী মেরিন লো পেন শহরতলির অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে অপরাধের জন্য দায়ী করে কড়া পদক্ষেপের ডাক দিচ্ছেন। ২০২৪ সালে ম্যাক্রোঁর আগাম নির্বাচনের ভুল সিদ্ধান্তের পর থেকে দেশটির পার্লামেন্ট কার্যত অচল এবং মধ্যপন্থি শক্তি ভেঙে পড়ায় উগ্র ডান ও বামের লড়াই দেশকে চরম মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে। ইপসোস-বিভিএর সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ৮৫ শতাংশ নাগরিক মনে করছেন ফ্রান্সের সামগ্রিক অবনতি ঘটছে এবং দেশের পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ট ৯৮ শতাংশ মানুষ। চরম খরায় কৃষি বিপর্যয় এবং জ্বালানি সংকটের পর এবার পর্যটন খাতও ইমেজ সংকটে পড়েছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কা তৈরি করেছে দেশটির সার্বভৌম ঋণ। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১৯ শতাংশে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সীমার প্রায় দ্বিগুণ। আগামী বছর দেশটিকে বাজার থেকে রেকর্ড ৩৪ হাজার কোটি ইউরো নতুন ঋণ নিতে হবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণী সংস্থা ‘অক্সফোর্ড ইকোনমিকস’ সতর্ক করে জানিয়েছে, রাজনৈতিক বিভক্তি দীর্ঘায়িত হলে ২০২৭ সালের নির্বাচন পার হয়ে গেলেও ফ্রান্সের এই রাজকোষীয় ঘাটতি ও অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঠেকানো সম্ভব হবে না।
মন্তব্যসমূহ