ঢাকা    মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ ৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

ফ্রান্সে ব্যাপক দাঙ্গার মুখে রাজনৈতিক বিভক্তি ও ঋণের বোঝা বৃদ্ধি

ফ্রান্সে ব্যাপক দাঙ্গার মুখে রাজনৈতিক বিভক্তি ও ঋণের বোঝা বৃদ্ধি
ছবি : সংগৃহীত
ফলো করুন

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির তীব্র মূল্যস্ফীতির ক্ষোভ রূপ নিয়েছে ব্যাপক নগর বিদ্রোহে। দাঙ্গা, লুটপাট, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং লাগামহীন ঋণের বোঝার এক সর্বনাশা বিষাক্ত চক্রে বন্দি হয়ে পড়েছে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ফ্রান্স। দেশটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার খোলামেলাভাবে স্বীকার করেছেন, “আমাদের সামনে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।” তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই স্বীকারোক্তিও মাঠপর্যায়ের বাস্তব সংকট ও সংকীর্ণতার ভয়াবহতা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারছে না।

সপ্তাহজুড়ে প্যারিস, মার্সেই, বোর্দোসহ বড় শহরগুলোতে ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি দুই বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এড়িয়ে টিকে থাকা ঐতিহাসিক লিমোজ শহরের শতবর্ষী সিটি হলেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে ভবনটির ঐতিহ্যবাহী ঘড়িসংবলিত চূড়া ধসে পড়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে স্কুল-কলেজের জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামা দিয়ে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শুধু গত সপ্তাহান্তের সহিংসতাতেই গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৪০০ জন। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ, যদিও তা এখনো কার্যকর হয়নি।

এই গভীর সংকটের মুখেও দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে কোনো কার্যকর ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা জানালেও কোনো বাস্তবসম্মত রূপরেখা দেননি; বরং ভাষণ শেষ করেই তিন দিনের সফরে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। অন্যদিকে কট্টর বামপন্থি নেতা জঁ-লুক মেলেশোঁ পুলিশি ব্যবস্থার সমালোচনা করে সরকারকে দোষারোপ করছেন, আর নির্বাচনে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দলের নেত্রী মেরিন লো পেন শহরতলির অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে অপরাধের জন্য দায়ী করে কড়া পদক্ষেপের ডাক দিচ্ছেন। ২০২৪ সালে ম্যাক্রোঁর আগাম নির্বাচনের ভুল সিদ্ধান্তের পর থেকে দেশটির পার্লামেন্ট কার্যত অচল এবং মধ্যপন্থি শক্তি ভেঙে পড়ায় উগ্র ডান ও বামের লড়াই দেশকে চরম মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে। ইপসোস-বিভিএর সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ৮৫ শতাংশ নাগরিক মনে করছেন ফ্রান্সের সামগ্রিক অবনতি ঘটছে এবং দেশের পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ট ৯৮ শতাংশ মানুষ। চরম খরায় কৃষি বিপর্যয় এবং জ্বালানি সংকটের পর এবার পর্যটন খাতও ইমেজ সংকটে পড়েছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কা তৈরি করেছে দেশটির সার্বভৌম ঋণ। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১৯ শতাংশে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সীমার প্রায় দ্বিগুণ। আগামী বছর দেশটিকে বাজার থেকে রেকর্ড ৩৪ হাজার কোটি ইউরো নতুন ঋণ নিতে হবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণী সংস্থা ‘অক্সফোর্ড ইকোনমিকস’ সতর্ক করে জানিয়েছে, রাজনৈতিক বিভক্তি দীর্ঘায়িত হলে ২০২৭ সালের নির্বাচন পার হয়ে গেলেও ফ্রান্সের এই রাজকোষীয় ঘাটতি ও অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঠেকানো সম্ভব হবে না।

ট্যাগ : ফ্রান্স সংকট প্যারিস সহিংসতা দাঙ্গা

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬


ফ্রান্সে ব্যাপক দাঙ্গার মুখে রাজনৈতিক বিভক্তি ও ঋণের বোঝা বৃদ্ধি

প্রকাশের তারিখ : ২০ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জ্বালানির তীব্র মূল্যস্ফীতির ক্ষোভ রূপ নিয়েছে ব্যাপক নগর বিদ্রোহে। দাঙ্গা, লুটপাট, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং লাগামহীন ঋণের বোঝার এক সর্বনাশা বিষাক্ত চক্রে বন্দি হয়ে পড়েছে ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ফ্রান্স। দেশটির সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার খোলামেলাভাবে স্বীকার করেছেন, “আমাদের সামনে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।” তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের এই স্বীকারোক্তিও মাঠপর্যায়ের বাস্তব সংকট ও সংকীর্ণতার ভয়াবহতা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারছে না।

সপ্তাহজুড়ে প্যারিস, মার্সেই, বোর্দোসহ বড় শহরগুলোতে ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি দুই বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এড়িয়ে টিকে থাকা ঐতিহাসিক লিমোজ শহরের শতবর্ষী সিটি হলেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে ভবনটির ঐতিহ্যবাহী ঘড়িসংবলিত চূড়া ধসে পড়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে স্কুল-কলেজের জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামা দিয়ে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শুধু গত সপ্তাহান্তের সহিংসতাতেই গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৪০০ জন। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ, যদিও তা এখনো কার্যকর হয়নি।

এই গভীর সংকটের মুখেও দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বে কোনো কার্যকর ঐক্য দেখা যাচ্ছে না। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা জানালেও কোনো বাস্তবসম্মত রূপরেখা দেননি; বরং ভাষণ শেষ করেই তিন দিনের সফরে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। অন্যদিকে কট্টর বামপন্থি নেতা জঁ-লুক মেলেশোঁ পুলিশি ব্যবস্থার সমালোচনা করে সরকারকে দোষারোপ করছেন, আর নির্বাচনে এগিয়ে থাকা কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি দলের নেত্রী মেরিন লো পেন শহরতলির অভিবাসী জনগোষ্ঠীকে অপরাধের জন্য দায়ী করে কড়া পদক্ষেপের ডাক দিচ্ছেন। ২০২৪ সালে ম্যাক্রোঁর আগাম নির্বাচনের ভুল সিদ্ধান্তের পর থেকে দেশটির পার্লামেন্ট কার্যত অচল এবং মধ্যপন্থি শক্তি ভেঙে পড়ায় উগ্র ডান ও বামের লড়াই দেশকে চরম মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে। ইপসোস-বিভিএর সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ৮৫ শতাংশ নাগরিক মনে করছেন ফ্রান্সের সামগ্রিক অবনতি ঘটছে এবং দেশের পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ট ৯৮ শতাংশ মানুষ। চরম খরায় কৃষি বিপর্যয় এবং জ্বালানি সংকটের পর এবার পর্যটন খাতও ইমেজ সংকটে পড়েছে। সবচেয়ে বড় শঙ্কা তৈরি করেছে দেশটির সার্বভৌম ঋণ। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১৯ শতাংশে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত সীমার প্রায় দ্বিগুণ। আগামী বছর দেশটিকে বাজার থেকে রেকর্ড ৩৪ হাজার কোটি ইউরো নতুন ঋণ নিতে হবে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণী সংস্থা ‘অক্সফোর্ড ইকোনমিকস’ সতর্ক করে জানিয়েছে, রাজনৈতিক বিভক্তি দীর্ঘায়িত হলে ২০২৭ সালের নির্বাচন পার হয়ে গেলেও ফ্রান্সের এই রাজকোষীয় ঘাটতি ও অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ঠেকানো সম্ভব হবে না।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ