সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দেশটির কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য জানায়নি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি জানতে পেরে দুই ব্যক্তির পরিচয়, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
এর মধ্যেই প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির একজন অভিবাসী শ্রমিক এবং অন্যজন ওমরাহ যাত্রী ছিলেন। আকাশপথের যোগাযোগ ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তাঁদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের লাগেজ বহনের সুবিধার্থে ২০০টি ট্রলি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তির একজনের বাড়ি বগুড়ায় এবং অন্যজন কুমিল্লার বাসিন্দা।
অনুষ্ঠানে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়া দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
সৌদিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আজেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই ব্যক্তির নাম নজরুল ইসলাম আবদুল বসির ও সিথি আক্তার।
সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের গ্রেপ্তারের পর তদন্ত পরিচালনা করে। তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে মামলাটি আদালতে পাঠানো হয়।
বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করেন এবং মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ জানিয়েছে, শরিয়াহ আইনের ‘তাআজির’ বিধানের আওতায় বিচারকের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই সাজা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চতর বিচারিক কর্তৃপক্ষও মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখে।
তবে বিচার চলাকালে অভিযুক্ত দুই বাংলাদেশির পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ করা হয়েছিল কি না, তাঁরা আপিলের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না কিংবা কনস্যুলার সহায়তা চেয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট সূত্র জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বাংলাদেশকে আগে থেকে অবহিত করা হয়নি।
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি বাংলাদেশ মিশনের নজরে আসে।
এরপর ঘটনার বিস্তারিত জানতে বৃহস্পতিবার সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠায় জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
চিঠিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির পূর্ণ পরিচয়, তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই বাংলাদেশির গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো পর্যায়েই বাংলাদেশ মিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়নি।
সৌদি কর্তৃপক্ষ প্রকাশিত তথ্যে তাঁদের নাম উল্লেখ করলেও পরিচয় নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য দেয়নি।
বিশেষ করে তাঁদের পাসপোর্ট, আকামা এবং নাগরিকত্বসংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে পরিচয় যাচাই এবং ঘটনার পূর্ণ বিবরণ জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশে কোনো নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁর অনুরোধে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলেটকে অবিলম্বে অবহিত করার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিকে কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার সুযোগ দিতে হয়।
তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি তাঁদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে অবহিত করার অনুরোধ করেছিলেন কি না, তা এখনো জানা যায়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দুই বাংলাদেশির বিষয়ে আগে থেকে বাংলাদেশ মিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানানোর কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে চিঠির জবাব পাওয়া গেলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিচয়, অভিযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হবে।
এদিকে দুই বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
তিনি জানিয়েছেন, আকাশপথের যোগাযোগ ও সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্যসমূহ