যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে স্বাক্ষরিত নিরাপত্তা কাঠামো চুক্তি যুদ্ধ শেষ করার বদলে দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
রয়টার্সের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির মূল শর্ত হলো হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা এবং তার পর দক্ষিণ লেবানন থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার। কিন্তু হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র হতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননের কোনো সরকারই বাস্তবে হিজবুল্লাহকে জোর করে নিরস্ত্র করার মতো অবস্থানে নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গত ২৬ জুন ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে এই কাঠামো চুক্তি সই হয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটিকে ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন চুক্তিটিকে দেশের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপ বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে সমালোচকদের মতে, চুক্তির কাঠামোতেই বড় দুর্বলতা রয়েছে। কারণ এতে লেবাননের ওপর হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণের বড় দায় চাপানো হয়েছে, কিন্তু ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে কার্যকর নিশ্চয়তা নেই। ফলে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে অনির্দিষ্টকাল অবস্থান করার কূটনৈতিক যুক্তি পেয়ে যেতে পারে।
বৈরুতভিত্তিক বিশ্লেষক মাইকেল ইয়াং বলেছেন, এই চুক্তি ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবাননে দীর্ঘ সময় থাকার সুযোগ করে দিতে পারে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের লেবাননি গবেষক ফাওয়াজ গের্গেসের মতে, চুক্তিটি বাস্তবায়নের আগেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে, কারণ এটি এমন এক শর্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা বাস্তবে পূরণ করা প্রায় অসম্ভব।
রয়টার্স জানায়, ইসরায়েল ইতোমধ্যে দক্ষিণ লেবাননে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার গভীর একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চুক্তির শর্তের কারণে এই বলয় দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে এবং কূটনৈতিক বৈধতা পেতে পারে।
চুক্তি নিয়ে লেবাননের ভেতরেও তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি একে লেবাননের অধিকার রক্ষার চুক্তি নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া সমঝোতা বলে সমালোচনা করেছেন। হিজবুল্লাহর প্রধান নাঈম কাসিম চুক্তিকে বাতিল ও আত্মসমর্পণ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েল চলে না যাওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চলবে।
হিজবুল্লাহকে জোর করে নিরস্ত্র করার যেকোনো চেষ্টা লেবাননের ভেতরে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। হিজবুল্লাহঘনিষ্ঠ মহলও বলছে, চুক্তির শর্তগুলো লেবাননের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে।
ইসরায়েল বলছে, হিজবুল্লাহ ও অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত তারা দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চল ধরে রাখবে। অন্যদিকে লেবানন রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বললেও বাস্তবে হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণই চুক্তির সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি তাৎক্ষণিকভাবে কূটনৈতিক অগ্রগতি মনে হলেও বাস্তবায়ন না হলে এটি যুদ্ধ শেষ করার বদলে নতুন এক দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ