জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতির প্রতিবাদে ফ্রান্সে আয়োজিত দেশব্যাপী বিক্ষোভ চরম সহিংসতা, ব্যাপক লুটপাট ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এ সময় ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের দেওয়া আগুনে দেশটির লিমোজ শহরের ১৪০ বছরেরও বেশি পুরোনো একটি ঐতিহাসিক টাউন হলের বড় অংশ পুড়ে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে অক্ষত থাকা এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি এবার বিক্ষোভের আগুনে রক্ষা পায়নি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন বিভাগীয় ও আঞ্চলিক শহরে সর্বস্তরের মানুষ ও ট্রেড ইউনিয়নের উদ্যোগে একযোগে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। তবে দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা দাঙ্গা ও সহিংসতায় রূপ নেয়। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু শনিবার রাতে জানান, দেশব্যাপী ব্যাপক ভাঙচুর, সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ১৫০ জন সদস্য আহত হয়েছেন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাজপথের এই বিক্ষোভে অংশ নেন। তবে আন্দোলনের মূল অংশীদার সিজিটি (CGT) শ্রমিক ইউনিয়ন দাবি করেছে, রাজপথে নামা মানুষের প্রকৃত সংখ্যা ছিল ৮ লাখেরও বেশি।
উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। বিপরীতে বিক্ষোভকারীরাও নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও তীব্র আতশবাজি ছোড়েন। দক্ষিণাঞ্চলীয় সাঁ-এতিয়েন শহরে দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেড বিস্ফোরণে ১৭ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারী কিশোরের ডান হাত উড়ে যাওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটে।
বিক্ষোভের আড়ালে একদল মুখোশধারী তরুণ প্যারিস, মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গ শহরে বেপরোয়া তাণ্ডব চালায়। তারা সুপরিকল্পিতভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো করে সুপারমার্কেট, ফার্মেসি, বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের শোরুম ও ইলেকট্রনিকসের দোকানে লুটপাট শেষে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ছাড়া মার্সেই ও লিলের দুটি পৌর ভবনে ভাঙচুর চালানো হয় এবং বোর্দোতে পুলিশের একটি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তীব্র মূল্যস্ফীতিকে এই আন্দোলনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনীতিবিদদের প্রতি অনাস্থা, অতি-ধনীদের অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধি এবং ২০২৭ সালের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জমতে থাকা ক্ষোভ। বিক্ষোভের সময় সাধারণ মানুষকে ‘ম্যাক্রোঁ পদত্যাগ করো’ এবং ১৭৮৯ সালের ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লবের প্রেক্ষাপট টেনে ‘এটাই বাস্তিল দুর্গ দখলের বিপ্লব’ বলে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কঠোর বার্তা দিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, যারা সরকারি কার্যালয়, ঐতিহাসিক স্থাপনা কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাটে অংশ নিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে।
সূত্র: এএফপি
মন্তব্যসমূহ