ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের সতর্ক করা বা শাস্তি দেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উরুগুয়ের একটি ম্যাচে হলুদ কার্ডের পরিবর্তে ফোনের মতো দেখতে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন রেফারি এদুয়ার্দো ভারেইয়া। পরীক্ষামূলক এই প্রযুক্তির লক্ষ্য, ম্যাচের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা এবং রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ করা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) কোপা উরুগুয়ের নাসিওনাল ও রেন্তিস্তাসের মধ্যকার ম্যাচে ডিভাইসটি ব্যবহার করা হয়। তবে প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের জায়গায় এটি স্থায়ীভাবে চালু হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
যেভাবে কাজ করবে ডিজিটাল কার্ড
নতুন ডিভাইসটির মাধ্যমে ম্যাচের বিভিন্ন ঘটনা ও শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের তথ্য সময়সহ রেকর্ড করা সম্ভব। এতে রেফারিদের হাতে লিখে সতর্কবার্তা বা শাস্তির বিবরণ সংরক্ষণ করার প্রয়োজন কমবে। পাশাপাশি উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘কমেট’ প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিক তথ্য জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ হবে বলে আশা করছেন প্রকল্পের উদ্যোক্তারা।
প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘রেফে’র পরিচালক মাউরো সাকো শুক্রবার উরুগুয়ের রেডিও ‘এল এস্পেকতাদোর দেপোর্তেস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ফুটবলের যেসব ক্ষেত্রে এখনো হাতে-কলমে কাজ করার প্রচলন রয়েছে, সেগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোই তাদের উদ্দেশ্য।
ডিজিটাল কার্ড তৈরির ধারণাটি আসে তিন বছরেরও বেশি সময় আগে। সাকো ও তার সহকর্মী দিয়েগো দে লা পেনা বৃষ্টির মধ্যে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় বিষয়টি নিয়ে ভাবেন। তারা লক্ষ করেন, রেফারিরা মাঠে খেলোয়াড়দের সতর্ক করা বা শাস্তি দেওয়ার তথ্য প্রথমে হাতে লিখে রাখেন, পরে তা ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্থানান্তর করেন। এই অতিরিক্ত কাজ কমানোর চিন্তা থেকেই ডিভাইসটি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরীক্ষায় ইতিবাচক অভিজ্ঞতা, তবে দৃশ্যমানতা নিয়ে উদ্বেগ
ডিভাইসটি ব্যবহার করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন রেফারি ভারেইয়া। তার অভিজ্ঞতায়, যন্ত্রটি হাতে ব্যবহার করা আরামদায়ক এবং এর সফটওয়্যার দ্রুত কাজ করে। তবে প্রচলিত কার্ড উঁচিয়ে দেখানোর মতো নাটকীয়তা নতুন ডিভাইসে কিছুটা কম বলে মনে করেন তিনি। তারপরও ম্যাচ-পরবর্তী প্রশাসনিক কাজ সহজ করতে এটি কার্যকর হতে পারে বলে তার বিশ্বাস।
প্রাথমিক পরীক্ষায় ডিভাইসটির স্ক্রিনের দৃশ্যমানতা নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সূর্যের আলোয় স্ক্রিন স্পষ্ট দেখা না যাওয়ায় এর আগের একটি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল। নতুন পরীক্ষাতেও মাঠের দর্শক ও টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের কেউ কেউ রেফারির সিদ্ধান্ত বুঝতে সমস্যায় পড়েন।
প্রকল্পটির সহ-পরিচালক দে লা পেনা জানিয়েছেন, এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে ডিভাইসটির উন্নয়নকাজ চলছে। তার মতে, সরাসরি মাঠে ডিভাইসটি দেখার অভিজ্ঞতা টেলিভিশনে দেখার চেয়ে ভালো ছিল। তবে হলুদ ও লাল কার্ডের পার্থক্য দর্শকদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এ সমস্যা কাটাতে ডেভেলপাররা ডিভাইসটির চারপাশে এলইডি আলো যুক্ত করার মতো পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন। তাদের লক্ষ্য, প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের রং যেন মাঠে এবং টেলিভিশনের পর্দায় সহজেই আলাদা করে বোঝা যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
নতুন ডিভাইসটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। কেউ এটিকে ফুটবলের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ প্রচলিত কার্ডের বিকল্প হিসেবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ডিভাইসটি নিয়ে বিভিন্ন মিমও তৈরি হয়েছে।
তবে সমালোচনা ও হাস্যরসকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন সাকো। তার মতে, নতুন কোনো উদ্ভাবন নিয়ে মানুষের আলোচনা হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সময় লাগে বলেও মনে করেন তিনি।
সাকোর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির ব্র্যান্ড নিবন্ধন করা হয়েছে এবং হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের পেটেন্টও নেওয়া হয়েছে। এর উন্নয়নকাজে চীনে অবস্থিত একটি দল যুক্ত রয়েছে।
ফিফার স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষা
ডিজিটাল কার্ডটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এর কার্যকারিতা, দৃশ্যমানতা ও ব্যবহারিক দিক আরও উন্নত করার পর দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার আশা করছেন ‘রেফে’র উদ্যোক্তারা।
তবে ভবিষ্যতে ইলেকট্রনিক ডিভাইসটি প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ডের জায়গা নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত নেই। আপাতত ম্যাচের শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের তথ্য দ্রুত ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ এবং রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।
মন্তব্যসমূহ