দিল্লির বহুল পরিচিত বিক্ষোভস্থল জন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। এর পরিবর্তে রাজধানীতে বিক্ষোভ ও সমাবেশের জন্য তিনটি বিকল্প স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো কেন্দ্রীয় দিল্লির রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি গ্রাউন্ড এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড। ১১ অক্টোবর জারি করা দিল্লি পুলিশের এক আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
তবে নতুন তিনটি জায়গা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা প্রশ্ন। কারণ, জন্তর মন্তরের তুলনায় এসব স্থানের একটির খরচ বেশি, আরেকটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এবং অন্যটি রাজধানীর কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে। ফলে রাজনৈতিক বিক্ষোভের জন্য জায়গাগুলো কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তিন বিকল্পের মধ্যে রামলীলা ময়দান কেন্দ্রীয় দিল্লির সবচেয়ে কাছাকাছি। জন্তর মন্তর থেকে এর দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরেই এখানে রাজনৈতিক সমাবেশ ও গণআন্দোলনের কর্মসূচি হয়ে আসছে। কিন্তু বড় কোনো বিক্ষোভ আয়োজন করতে হলে এই মাঠ ব্যবহারে অর্থ খরচ করতে হবে। দিল্লি পৌর করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ১২ একর আয়তনের মাঠটির বুকিং ফি প্রতিদিন ৫০ হাজার রুপি এবং ফেরতযোগ্য জামানত ৫৫ হাজার রুপি। পাশাপাশি দিল্লি ট্রাফিক পুলিশের অনাপত্তিপত্রও প্রয়োজন হবে।
সমস্যা আরও আছে। মাঠের একটি বড় অংশ ভারী যানবাহন পার্কিংয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং পুরো নির্ধারিত অংশ বুক করতে হয়। ছোট সংগঠনগুলোর জন্য এটি বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। জন্তর মন্তরের মতো গাছপালায় ঘেরা পরিবেশও রামলীলা ময়দানে নেই। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিক্ষোভ করার ক্ষেত্রেও অসুবিধা হতে পারে। উৎসবের মৌসুমে মাঠটির চাহিদা আরও বেড়ে যাওয়ায় বুকিং পাওয়াও কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে পূর্ব দিল্লির শাহদারায় অবস্থিত সিবিডি গ্রাউন্ড আয়তনে প্রায় ১২ একর। এটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় ঘেরা। আশপাশে রয়েছে আবাসিক ভবন, বিপণিবিতান, হোটেল ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থল। ফলে বড় রাজনৈতিক বিক্ষোভ হলে যানজট এবং স্থানীয় মানুষের চলাচলে বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকা এই মাঠও মূলত ভাড়ায় ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়। বিক্ষোভের ক্ষেত্রে বিনা মূল্যে জায়গা ব্যবহারের সুযোগ কীভাবে থাকবে, সে বিষয়ে নতুন নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তৃতীয় বিকল্প বুরারি গ্রাউন্ড, যেটি নিরঙ্কারি গ্রাউন্ড নামেও পরিচিত। প্রায় ৫০ একর আয়তনের এই মাঠ তিনটির মধ্যে সবচেয়ে বড়। জন্তর মন্তর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৮ কিলোমিটার। বড় সমাবেশের জন্য জায়গাটি সুবিধাজনক হলেও রাজধানীর কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকা থেকে অনেক দূরে হওয়ায় বিক্ষোভের রাজনৈতিক প্রভাব ও দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
দিল্লির নগরজীবনের ইতিহাসবিদ ও লেখক সোহেল হাশমি মনে করেন, বিক্ষোভের জায়গা শুধু বড় হলেই হয় না। প্রতিবাদকারীরা যাদের কাছে দাবি জানাতে চান, তাদের কাছাকাছি থাকা এবং সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সহজে পৌঁছাতে পারাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রতিবাদস্থল যত দূরে সরবে, আন্দোলনের দাবি সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছানো তত কঠিন হতে পারে।
জন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর অবস্থান সংসদ ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার কাছাকাছি হওয়ায় বিক্ষোভকারীরা সহজেই রাজনৈতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতেন। এখন নতুন তিনটি স্থানের মধ্যে রামলীলা ময়দান তুলনামূলকভাবে কাছে হলেও খরচ ও বুকিংয়ের সমস্যা রয়েছে। আর বুরারি ও সিবিডি গ্রাউন্ডের ক্ষেত্রে দূরত্ব ও স্থানীয় পরিবেশ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে দিল্লি পুলিশের নতুন আদেশে জন্তর মন্তরকে সরাসরি ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়েছে বলা হয়নি। বরং এটিকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে ডিনোটিফাই বা বাদ দেওয়া হয়েছে। একই আদেশে রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড ও সিবিডি গ্রাউন্ডকে নতুন নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল করা হয়েছে। নতুন তিন স্থানে বিক্ষোভ আয়োজনের বিস্তারিত নিয়মকানুন আলাদা এসওপির মাধ্যমে জানানো হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ফলে দিল্লিতে এখন মূল প্রশ্ন শুধু বিক্ষোভ কোথায় হবে, তা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, নতুন স্থানগুলো কি প্রতিবাদ করার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের দাবি ক্ষমতার কেন্দ্র, সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের কাছে আগের মতো দৃশ্যমান রাখতে পারবে?
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস
মন্তব্যসমূহ