ঢাকা    সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ ২২ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন

মহাকাশ দখলের লড়াই

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন
ছবি : সংগৃহীত
ফলো করুন

চাঁদের বুকে স্থায়ী মানববসতি গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ গবেষণার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে বিশ্বের প্রধান মহাকাশ শক্তিগুলো। এ লক্ষ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে ‘সেলেনা’ নামে একটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদে দীর্ঘ সময় ধরে শুধু সৌরশক্তির ওপর নির্ভর করে গবেষণা বা মানববসতি পরিচালনা করা কঠিন। এর অন্যতম কারণ হলো, চাঁদের রাত প্রায় দুই সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। এই দীর্ঘ অন্ধকার পর্বে সূর্যালোক না থাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে চাঁদের পৃষ্ঠে তাপমাত্রাও অত্যন্ত কমে যায়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের স্থায়ী ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ ও তাপের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নাসা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ২০ কিলোওয়াট ক্ষমতার ‘লুনার রিঅ্যাক্টর-১’ স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবিত এই চুল্লি কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই প্রায় পাঁচ বছর একটানা কার্যকর থাকার সক্ষমতা রাখবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে পরিকল্পিত ‘সেলেনা’ নামের চুল্লিটির ক্ষমতা হবে ১০ কিলোওয়াট। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

চাঁদে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিয়ে এমন উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সামনে এলেও বিজ্ঞানীদের একটি অংশ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, পারমাণবিক চুল্লি মহাকাশে পাঠানোর সময় কোনো রকেট দুর্ঘটনার শিকার হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দুর্ঘটনা উৎক্ষেপণের সময় ঘটলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া চাঁদের চরম ও প্রতিকূল পরিবেশে পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। পৃথিবীর বাইরে কোনো পারমাণবিক স্থাপনা স্থাপনের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

চাঁদে পারমাণবিক স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনা শুধু বৈজ্ঞানিক বা প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে নতুন ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদের কোনো অংশের ওপর সার্বভৌম মালিকানা দাবি করতে পারে না। ফলে চাঁদের জমি কোনো দেশের নিজস্ব ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার সুযোগ নেই।

তবে পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তার যুক্তিতে কোনো দেশ যদি নিজেদের চুল্লির চারপাশে নিরাপত্তা, সংরক্ষিত বা প্রবেশ-নিষিদ্ধ এলাকা তৈরি করে, তাহলে অন্য দেশের নভোচারীদের সেখানে চলাচল বা গবেষণার ক্ষেত্রে বাস্তবিক বাধা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে চাঁদের বিভিন্ন এলাকায় কার্যত প্রভাববলয় তৈরির প্রশ্ন সামনে আনতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এই সম্ভাব্য প্রতিযোগিতার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের চন্দ্র পারমাণবিক প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিতে আগ্রহী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে চীন ও রাশিয়াও যৌথভাবে নিজেদের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে।

ফলে চাঁদে ভবিষ্যৎ মানববসতি ও গবেষণার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি এখন শুধু মহাকাশবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, সম্পদ ব্যবহার, মহাকাশ আইন এবং পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রশ্নও।

ট্যাগ : নাসা চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬


চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন

প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

চাঁদের বুকে স্থায়ী মানববসতি গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ গবেষণার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে বিশ্বের প্রধান মহাকাশ শক্তিগুলো। এ লক্ষ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে ‘সেলেনা’ নামে একটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদে দীর্ঘ সময় ধরে শুধু সৌরশক্তির ওপর নির্ভর করে গবেষণা বা মানববসতি পরিচালনা করা কঠিন। এর অন্যতম কারণ হলো, চাঁদের রাত প্রায় দুই সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। এই দীর্ঘ অন্ধকার পর্বে সূর্যালোক না থাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে চাঁদের পৃষ্ঠে তাপমাত্রাও অত্যন্ত কমে যায়।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের স্থায়ী ঘাঁটিতে বিদ্যুৎ ও তাপের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারমাণবিক শক্তিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নাসা চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ২০ কিলোওয়াট ক্ষমতার ‘লুনার রিঅ্যাক্টর-১’ স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবিত এই চুল্লি কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই প্রায় পাঁচ বছর একটানা কার্যকর থাকার সক্ষমতা রাখবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে পরিকল্পিত ‘সেলেনা’ নামের চুল্লিটির ক্ষমতা হবে ১০ কিলোওয়াট। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রায় ১০ বছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

চাঁদে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নিয়ে এমন উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সামনে এলেও বিজ্ঞানীদের একটি অংশ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, পারমাণবিক চুল্লি মহাকাশে পাঠানোর সময় কোনো রকেট দুর্ঘটনার শিকার হলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দুর্ঘটনা উৎক্ষেপণের সময় ঘটলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া চাঁদের চরম ও প্রতিকূল পরিবেশে পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। পৃথিবীর বাইরে কোনো পারমাণবিক স্থাপনা স্থাপনের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

চাঁদে পারমাণবিক স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনা শুধু বৈজ্ঞানিক বা প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে নতুন ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদের কোনো অংশের ওপর সার্বভৌম মালিকানা দাবি করতে পারে না। ফলে চাঁদের জমি কোনো দেশের নিজস্ব ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার সুযোগ নেই।

তবে পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তার যুক্তিতে কোনো দেশ যদি নিজেদের চুল্লির চারপাশে নিরাপত্তা, সংরক্ষিত বা প্রবেশ-নিষিদ্ধ এলাকা তৈরি করে, তাহলে অন্য দেশের নভোচারীদের সেখানে চলাচল বা গবেষণার ক্ষেত্রে বাস্তবিক বাধা তৈরি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে চাঁদের বিভিন্ন এলাকায় কার্যত প্রভাববলয় তৈরির প্রশ্ন সামনে আনতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এই সম্ভাব্য প্রতিযোগিতার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের চন্দ্র পারমাণবিক প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিতে আগ্রহী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে চীন ও রাশিয়াও যৌথভাবে নিজেদের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে।

ফলে চাঁদে ভবিষ্যৎ মানববসতি ও গবেষণার জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি এখন শুধু মহাকাশবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, সম্পদ ব্যবহার, মহাকাশ আইন এবং পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রশ্নও।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ