ভারতের বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) দেশটির যুব নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এবং ছাত্র ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন পৃথক কর্মসূচি পালন করে।
সিজেপি মুম্বাইয়ে সমাবেশের আয়োজন করেছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশব্যাপী আন্দোলন বিস্তারের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে ছাত্র ও অধিকারকর্মীদের একটি জোট রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দেয়।
শুক্রবার সকালে দিল্লিতে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী জড়ো হলে পুলিশ তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বাসে তুলে অন্যত্র নিয়ে যায়। একই সময়ে আশপাশের কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয় এবং এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
বিক্ষোভস্থলের চারপাশে শত শত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। লাউডস্পিকারে পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত না হওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।
পুলিশ যখন এক বিক্ষোভকারীকে বাসে তুলছিল, তখন ঋষভ সিং নামে ওই বিক্ষোভকারী বলেন, ‘প্রতিবাদ করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার। ভোট চুরির অভিযোগের বিষয়ে আমরা সরকারের কাছে জবাব চাই।’
এদিকে মুম্বাইয়েও শুক্রবার বিকেলে বিক্ষোভকারীদের সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। সেখানে আগে থেকেই বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভ ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে চলমান বিরোধের সর্বশেষ ধাপ। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত নির্বাচন কমিশন বর্তমানে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে পড়েছে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-কে সুবিধা দিতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন ও সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গত মাসে ভারতীয় সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ মাসে ভোটার তালিকা সংশোধন, ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দুই উপ-কমিশনার অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় মতভেদ থাকা স্বাভাবিক বিষয়।
সিজেপির আহ্বায়ক সৌরভ দাস বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘আমরা পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু সমাজে পরিবর্তন আনার যে শেষ হাতিয়ার আমাদের কাছে আছে, অর্থাৎ ভোটাধিকার, সেটিই যদি কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে কিছুই বদলাবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব।’
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গত বছর শুরু হওয়া দেশব্যাপী ভোটার যাচাই কার্যক্রম। সমালোচকদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার কারণে লাখো বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, মৃত, দ্বৈত বা অযোগ্য ভোটারদের নাম অপসারণের জন্যই এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
শুক্রবার কমিশন নতুন যোগ্য ভোটার এবং যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের নিবন্ধনের জন্য কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি কমিশনের অবস্থান কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত।
এদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোও আগামী ৬ অক্টোবর থেকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে বেকারত্ব ও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ থেকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র উত্থান ঘটে।
অভিজিৎ দিপকের নেতৃত্বাধীন এই যুব আন্দোলন প্রশ্নপত্র ফাঁসবিরোধী গণবিক্ষোভের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পায়। ওই আন্দোলনের জেরে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দিল্লির বিক্ষোভকারী জুন মনিরয়, যার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, বলেন, ‘মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ করা উচিত।’
মন্তব্যসমূহ