যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক সফর নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের অবস্থান ও তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদের অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করা এবং যুক্তরাষ্ট্র সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে তার বৈঠক না হওয়া বিষয়গুলো বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর বক্তব্যের প্রতিবাদে ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ ৭৭টি দেশের প্রতিনিধিরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। পরে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র প্রায় আট ঘণ্টা অবস্থান করে ইসরাইলে ফিরে যান নেতানিয়াহু। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরাইলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেনকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করে ফিরেছেন—এমন ঘটনা তার মনে পড়ে না।
এবার যুক্তরাষ্ট্র সফরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হয়নি। মার্কো রুবিওর সঙ্গেও তার কোনো বৈঠক হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসে ভাষণ দেওয়ার জন্যও নেতানিয়াহু কোনো আমন্ত্রণ পাননি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর আগের যুক্তরাষ্ট্র সফরের তুলনায় এবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে বেশি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়। ট্রাম্প বিমানবন্দরে শি জিনপিংকে স্বাগত জানান এবং তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচন সামনে থাকায় তিনি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা প্রতিরোধে তার সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, হামাসের ওই হামলার আগে মিসর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা গাজা থেকে বড় ধরনের হামলার সম্ভাবনা সম্পর্কে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন। তবে তিনি ওই সতর্কবার্তায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
জাতিসংঘে দেওয়া নেতানিয়াহুর ভাষণ নিয়েও বিশ্লেষণ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ইসরাইলের দর্শকদের কাছে সর্বোচ্চভাবে পৌঁছানোর জন্য দেশটির প্রাইম টাইমের সঙ্গে মিল রেখে তার ভাষণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইসরাইলি বিশ্লেষক জোনাথন ওফিরের মত উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ভাষণে হিব্রু ভাষায় বাইবেলের একটি বাক্যাংশ ব্যবহার করেছিলেন, যা নিজ দেশের দর্শকদের উদ্দেশে রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্ক নিয়েও প্রতিবেদনে বিভিন্ন দাবি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে এই দাবির পক্ষে প্রতিবেদনে কোনো নির্দিষ্ট সরকারি নথি বা প্রাথমিক সূত্র উল্লেখ করা হয়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি এবং ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে। লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
গাজা যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং ফিলিস্তিনি হতাহতের ঘটনাকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর জনমত পরিবর্তন হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি জরিপের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬২ শতাংশ উত্তরদাতা নেতানিয়াহু সরকারের বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
এ ছাড়া অন্য একটি জরিপের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ৬০ শতাংশ আমেরিকান ইহুদি আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে সরবরাহ করা লেখায় ওই জরিপের প্রতিষ্ঠান, নমুনা ও পদ্ধতির বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনে পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতি ও ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডাসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ পশ্চিম তীরের বসতিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তিনি গাজায় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের মতো পদক্ষেপ পশ্চিম তীরেও নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
লেখাটির মূল বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলো গাজা যুদ্ধের রাজনৈতিক দায় নেতানিয়াহুর ওপর কেন্দ্রীভূত করে নিজেদের ভূমিকা আড়াল করার চেষ্টা করছে। লেখকের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ দীর্ঘ সময় ইসরাইলকে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ক্ষমতা থেকে সরে গেলেই ইসরাইলের ফিলিস্তিননীতি বা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ দেশটির অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান রয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন।
সব মিলিয়ে, প্রতিবেদনটি নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর, জাতিসংঘে তার ভাষণ, গাজা যুদ্ধ, পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের পরিবর্তন নিয়ে একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছে।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ