শ্রমিকদের আবাসন, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও শোভন পরিবেশ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম থেকেই কার্যকর উদ্যোগ শুরুর কথা জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে চট্টগ্রামের সার্বিক শ্রম পরিস্থিতি, কর্মক্ষেত্রে পেশাগত স্বাস্থ্য ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণবিষয়ক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, শ্রমিকদের কল্যাণে দৃশ্যমান কার্যক্রম চট্টগ্রাম থেকে শুরু করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে এবং সেখান থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, শ্রমিকদের আবাসন, তাদের সন্তানদের লেখাপড়া ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সুবিধা একসঙ্গে বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। তবে এক বা দুটি উদ্যোগ দিয়ে কাজ শুরু করা সম্ভব। একটি উদ্যোগ সফল হলে অন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও এলাকাও একই ধরনের কার্যক্রম গ্রহণে উৎসাহিত হবে।
শিল্পাঞ্চলের ভেতর শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। শ্রমিক কল্যাণে আইন ও নীতিমালায় বিভিন্ন ব্যবস্থা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী।
এ জন্য শিল্পমালিক ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে নিজ নিজ শিল্প এলাকার পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। শিল্পমালিকদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনায় বসার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে সংসদ সদস্যদেরও এসব আলোচনায় যুক্ত করার কথা বলেন আরিফুল হক চৌধুরী।
শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় সেবা দ্রুত নিশ্চিত করতে বড় ধরনের স্থায়ী ভবন নির্মাণের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করে স্টিল স্ট্রাকচারভিত্তিক অবকাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেন শ্রমমন্ত্রী। তার মতে, এ পদ্ধতিতে কয়েক মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সেবা চালু করা সম্ভব।
বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে শ্রমিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমের জন্য জায়গা বরাদ্দের বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। জায়গা পাওয়া গেলে স্টিল স্ট্রাকচারের মাধ্যমে দ্রুত একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ প্রয়োজনীয় সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্ত্রী জানান, চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে অবতরণের পরই তিনি বিমানমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। পরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও আলোচনা করে দ্রুত জায়গা বরাদ্দের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রামে শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ইতোমধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন আরিফুল হক চৌধুরী। ঈদ উপলক্ষে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।
শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিল্পমালিক ও শ্রমিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান মন্ত্রী। চট্টগ্রামে কার্যক্রম সফলভাবে শুরু করা গেলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
শিল্পমালিক, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিজ নিজ এলাকার সমস্যা এবং প্রয়োজনীয়তার বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়ার আহ্বান জানান আরিফুল হক চৌধুরী। শ্রমিক কল্যাণের যেসব বিষয় অন্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় রয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শ্রমমন্ত্রী বলেন, “মানুষকে আমরা অনেক আশা দিয়েছি। মানুষের অনেক প্রত্যাশা আমাদের ওপর। এখন শুধু কথায় নয়, বাস্তবে কাজ করে মানুষকে দেখাতে হবে। সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। তাই সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না, কল্পনার মধ্যে থাকলেও চলবে না। স্বপ্ন ও কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলে একটি সুন্দর ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।”
সভায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে আবাসন ও সুচিকিৎসা—এই দুটি বিষয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলা হলে তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মস্পৃহা ও নিরাপত্তাবোধ বাড়বে। একইভাবে নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা হলে পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে শ্রমিকরা কাজে যেতে পারবেন এবং এতে তাদের কর্মদক্ষতাও বাড়বে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে সভায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার, চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এবং চট্টগ্রাম জেলা শিল্প পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগমসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, শ্রম ও শিল্প খাতের প্রতিনিধি এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চট্টগ্রামের অভ্যন্তরে প্রবাসী কর্মীদের লাগেজ পরিবহনের জন্য ট্রলি কার্যক্রম উদ্বোধন এবং প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক পরিদর্শন করেন মন্ত্রী।
মন্তব্যসমূহ