কয়েক মাসের জল্পনা-কল্পনা ও পরিকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ইন্দোনেশিয়া অবশেষে ইতালির বিমানবাহী রণতরী জিউসেপ্পে গারিবাল্ডি গ্রহণ করেছে। দেশটি রণতরীটিকে কেআরআই শ্রীবিজয়া নামে নিজ নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইন্দোনেশিয়া তাদের প্রথম বিমানবাহী রণতরীটি গ্রহণ করে। এর আগে এটি ছিল ইতালীয় নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ রণতরী আইটিএস জিউসেপ্পে গারিবাল্ডি। জাহাজটির নাম রাখা হয়েছিল ১৯ শতকের বিখ্যাত ইতালীয় দেশপ্রেমিক জিউসেপ্পে গারিবাল্ডির নামে। তিনি ইতালির একীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
গ্যাস টার্বাইনচালিত এই বিমানবাহী রণতরীটির আনুষ্ঠানিকভাবে নাম পরিবর্তন করা হয় বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সেখানে ইতালির ত্রিবর্ণ পতাকা নামিয়ে ইন্দোনেশিয়ার লাল-সাদা পতাকা উত্তোলন করা হয়। এরপর জাহাজটিকে কেআরআই শ্রীবিজয়া নামে পুনরায় নৌবাহিনীতে কমিশন করা হয়।
এখন এই বিমানবাহী রণতরীটির নামকরণ করা হয়েছে প্রাচীন শ্রীবিজয়া রাজ্যের নামে, যেটি শ্রীবিজয়া সাম্রাজ্য নামেও পরিচিত। এটি ছিল একটি শক্তিশালী সামুদ্রিক রাজ্য, যা ইন্দোনেশিয়ার বিস্তীর্ণ দ্বীপপুঞ্জ নিয়ন্ত্রণ করত এবং ৭ম থেকে ১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রধান সামুদ্রিক শক্তি হিসেবে আধিপত্য বিস্তার করেছিল।
ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর মুখপাত্র তুঙ্গুল এক বিবৃতিতে বলেন, ‘জাহাজটি আগে ইতালীয় নৌবাহিনীতে কাজ করেছে। এখন এটি কেআরআই শ্রীবিজয়া নাম ধারণ করছে এবং লাল-সাদা পতাকা উড়িয়ে ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌমত্ব ও সেবার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে।’
কেআরআই শ্রীবিজয়া বিমানবাহী রণতরী, পুরোনো, কিন্তু এখনো সক্ষম। ইতালির নৌবাহিনী ১৯৮৫ সালে এটিকে সেবায় আনে। ৫৯১ ফুট দৈর্ঘের রণতরীটির প্রস্থ ১১০ ফুট। এর ডিসপ্লেসমেন্ট তথা পানিতে নামানোর পর এটি ১৪ হাজার ১৫০ টন পানি এর তলদেশ থেকে সরিয়ে দেয়।
মোট ৪টি ফিয়াটঅ্যাভিও এলএম ২৫০০ গ্যাস টারবাইন যা মোট ৮১ হাজার হর্সপাওয়ার উৎপন্ন করে এবং দুটি শ্যাফটকে শক্তি জোগায়। এর সর্বোচ্চ সর্বোচ্চ গতি ৩০ নট বা ঘণ্টায় ৫৫ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার। একবার জ্বালানি নিয়ে জাহাজটি ৭ হাজার নটিক্যাল মাইল বা ১২ হাজার ৯৬৪ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে।
রণতরীটিতে হ্যাঙ্গার ও ফ্লাইট ডেক মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৮টি বিমান/উড়োজাহাজ রাখা সম্ভব। এ ছাড়া, এটিতে সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, তিন-নলবিশিষ্ট টর্পেডো টিউব এবং ৪০ মিলিমিটার গান রয়েছে। রণতরীটি সবমিলিয়ে ৪০০ জন ক্রু বহন করতে সক্ষম।
৪১ বছর বয়সী এই হালকা বিমানবাহী রণতরীটি ১৯৮৫ সালে প্রথম ইতালীয় নৌবাহিনীতে কমিশন পায়। ২০২৪ সালে অবসর নেওয়ার আগে এটি প্রায় ৪০ বছর সেবা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বৃহত্তর অংশীদারত্বের অংশ হিসেবে রোম জাকার্তাকে এই যুদ্ধজাহাজটি উপহার দিয়েছে। এই অংশীদারত্বের আওতায় সাবমেরিন ও বিমান বিক্রিও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। ইতালীয় নৌবাহিনীর সাবেক ফ্ল্যাগশিপটি গত সপ্তাহে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে পৌঁছায়। পৌঁছাতে জাহাজটির ২৫ দিন সময় লাগে। এই দীর্ঘ যাত্রায় এটি সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর পেরিয়ে ভারত মহাসাগর অতিক্রম করে।
কেআরআই শ্রীবিজয়া হিসেবে জাহাজটির এয়ার উইংয়ে সম্পূর্ণভাবে ১০ থেকে ১৮টি রোটারি-উইং বা হেলিকপ্টার শ্রেণির উড়োজাহাজ থাকবে। কারণ ইন্দোনেশিয়ার কাছে বর্তমানে বিমানবাহী রণতরী থেকে পরিচালনার উপযোগী কোনো ফিক্সড-উইং বিমান নেই। ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী এই যুদ্ধজাহাজটিকে একটি মোবাইল কমান্ড ও সহায়তা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করবে। এর মাধ্যমে পুরো দ্বীপপুঞ্জজুড়ে সামুদ্রিক অভিযানে ড্রোন ও হেলিকপ্টার পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এর মধ্যে যুদ্ধ অভিযানও থাকতে পারে। তবে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই বিমানবাহী রণতরীর প্রধান ভূমিকা হবে বন ও পিটভূমিতে ছড়িয়ে পড়া আগুন মোকাবিলা করা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড ক্রমেই বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।
ইন্দোনেশিয়া হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ, যার কাছে বিমানবাহী রণতরী রয়েছে। এর আগে থাইল্যান্ড এইচটিএমএস চাকরি নারুয়েবেতকে ১৯৯৭ সালে রয়্যাল থাই নেভিতে কমিশন করায়। শ্রীবিজয়ার বিপরীতে চাকরি নারুয়েবেত থাইল্যান্ডের জন্য নতুন করে কেনা হয়েছিল, যদিও বিমানবাহী রণতরীটি স্পেনে নির্মিত হয়।
ইতালি বিমানবাহী রণতরীটি ইন্দোনেশিয়াকে বিনামূল্যে দিয়েছে। তবে এর মাধ্যমে ইতালিও এক অর্থে লাভবান হয়েছে, কারণ জাহাজটি অবসরে নেওয়া ও নিষ্ক্রিয় করার খরচ তাদের বহন করতে হয়নি। ইন্দোনেশিয়া বর্তমানে নিজেদের দেশে শূন্য থেকে এ ধরনের একটি যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে সক্ষম নয়। ফলে দান করা এই বিমানবাহী রণতরীটি জাকার্তার জন্য স্বাগত উপহার ছিল।
তবে নতুন শ্রীবিজয়া শেষ পর্যন্ত বেশ ব্যয়বহুল ‘বিনামূল্যের’ উপহার হয়ে উঠতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার মান অনুযায়ী জাহাজটি সংস্কার, পুনর্গঠন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করতে জাকার্তার প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (৯০০ মিলিয়ন ডলার) ব্যয় হতে পারে। বর্তমানে এই প্রকল্পের জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে, এটি তার চেয়েও বেশি। ইন্দোনেশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় প্রথমে প্রাথমিক কর্মসূচির জন্য ৪৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করেছিল। কিন্তু ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন এর সঙ্গে ভারী পরিবহন হেলিকপ্টারের জন্য আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ইউটিলিটি হেলিকপ্টার ও তুরস্কের বায়রাকতার টিবি–৩ নৌ ড্রোনের জন্য আরও কয়েকশ মিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে।
সমালোচকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, জাহাজটির রূপান্তর ও সংস্কারের ব্যয় ইন্দোনেশিয়ার বার্ষিক নৌবাহিনী বাজেটের একটি বিশাল অংশ নিয়ে নিতে পারে। বিশেষ করে বিমানবাহী রণতরীটির বর্ধিত কার্যকর সেবাজীবন হয়তো মাত্র ১৫ থেকে ২০ বছর হতে পারে। মনে রাখা দরকার, গারিবাল্ডি প্রথম ১৯৮৫ সালে সেবায় প্রবেশ করেছিল এবং এখন এটি নৌবাহিনীতে সেবার পঞ্চম দশকে প্রবেশ করেছে। ফলে এটি আর কত দিন কার্যকরভাবে টিকে থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শ্রীবিজয়া অবসরে যাওয়ার পর জাহাজটির পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিংয়ের খরচও জাকার্তাকেই বহন করতে হবে।
মন্তব্যসমূহ