আজকের দিনটি অন্য দিনের তুলনায় কিছুটা আলাদা। কারণ আজ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে আসে। আকাশের দিকে তাকালে এর বিশেষ কোনো পরিবর্তন চোখে পড়বে না, কিন্তু পৃথিবীর কক্ষপথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এই ঘটনাকে বলা হয় বিষুব বা ইকুইনক্স।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর বিষুব আজ, ২৩ সেপ্টেম্বর। ঢাকার স্থানীয় সময় অনুযায়ী এ বিষুব ঘটছে সকাল ৬টা ৫ মিনিটে। তবে ‘দিন-রাত সমান’ কথাটি শুনে অনেকের মনে হতে পারে, এদিন ঠিক ১২ ঘণ্টা দিন ও ১২ ঘণ্টা রাত থাকবে। বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন।
ঢাকায় আজ সূর্যোদয় প্রায় সকাল ৫টা ৪৭ মিনিটে এবং সূর্যাস্ত প্রায় বিকেল ৫টা ৫৪ মিনিটে। অর্থাৎ দিনের আলো থাকবে প্রায় ১২ ঘণ্টা ৬ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড। ফলে বিষুবের দিনেও দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য একেবারে সমান হয় না; বরং একে অপরের খুব কাছাকাছি থাকে।
বিষুব হলো বছরের এমন দুটি সময়ের একটি, যখন পৃথিবীর দুই গোলার্ধ সূর্যের আলো প্রায় সমানভাবে পায়। এ সময় সূর্যের আলো বিষুবরেখার ওপর প্রায় সরাসরি পড়ে। ফলে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য অনেকটাই কমে আসে।
বছরে সাধারণত দুটি বিষুব ঘটে—একটি মার্চে এবং অন্যটি সেপ্টেম্বরে। মার্চের বিষুবের পর উত্তর গোলার্ধে বসন্ত এবং দক্ষিণ গোলার্ধে শরৎ শুরু হয়। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরের বিষুবের পর উত্তর গোলার্ধে শরৎ এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্তের ঋতু শুরু হয়।
দিন-রাতের দৈর্ঘ্যের এই পরিবর্তনের মূল কারণ পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থান এবং সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর পরিক্রমণ। পৃথিবী তার কক্ষপথের তুলনায় সোজা অবস্থায় ঘোরে না। এর ঘূর্ণন অক্ষ প্রায় ২৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি হেলে আছে। এই হেলানো অবস্থানের কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে ভিন্ন মাত্রায় ঝুঁকে থাকে।
কখনো উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি হেলে থাকে, আবার কখনো দক্ষিণ গোলার্ধ। ফলে এক গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ে এবং অন্য গোলার্ধে কমে। কিন্তু বিষুবের সময় পৃথিবীর অবস্থান এমন হয় যে সূর্যের আলো বিষুবরেখার ওপর প্রায় সরাসরি পড়ে। এতে দুই গোলার্ধে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
তবে বিষুবের দিনেও কেন ঠিক ১২ ঘণ্টা দিন ও ১২ ঘণ্টা রাত হয় না—এর পেছনেও রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সূর্যের কেন্দ্র নয়, সূর্যের ওপরের প্রান্তকে বিবেচনা করা হয়। একই সঙ্গে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যের আলোকে কিছুটা বাঁকিয়ে দেয়। ফলে সূর্য প্রকৃত অবস্থানের তুলনায় কিছুটা আগে উঠেছে বা পরে অস্ত গেছে বলে দেখা যায়।
এই কারণেই বিষুবের দিনেও পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে দিনের আলো ১২ ঘণ্টার চেয়ে কিছুটা বেশি থাকতে পারে। ঢাকার ক্ষেত্রেও আজ প্রায় ১২ ঘণ্টা ৬ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড দিনের আলো থাকার বিষয়টি এরই উদাহরণ।
সেপ্টেম্বরের বিষুবের পর উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে কমতে থাকবে এবং রাত দীর্ঘ হতে থাকবে। অর্থাৎ বাংলাদেশসহ উত্তর গোলার্ধের দেশগুলোতে আগামী দিনগুলোতে সূর্যের আলো পাওয়ার সময় ক্রমশ কমবে।
ঢাকার হিসাবেও এ পরিবর্তন দেখা যাবে। ২৩ সেপ্টেম্বর দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ঘণ্টা ৬ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড থাকলেও পরদিন তা প্রায় ১২ ঘণ্টা ৫ মিনিট ২২ সেকেন্ডে নেমে আসবে। এরপর দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে আরও কমতে থাকবে।
বিষুব শুধু দিন ও রাতের হিসাবের বিষয় নয়, এটি পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় তার অক্ষের হেলানো অবস্থান বজায় রাখে। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের আলো উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে ভিন্নভাবে পড়ে। মার্চ ও সেপ্টেম্বরের বিষুবের সময় দুই গোলার্ধে সূর্যালোক পাওয়ার পার্থক্য তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
প্রতিদিন আমরা সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখি। কিন্তু পৃথিবীর মহাজাগতিক গতির কারণে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় প্রতিদিনই সামান্য করে পরিবর্তিত হয়। আজকের প্রায় সমান দিন-রাতও সেই ধারাবাহিক পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।
সেপ্টেম্বরের বিষুবের পর উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য কমতে থাকবে এবং রাত দীর্ঘ হবে। ঢাকাতেও প্রতিদিনের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়ে সেই পরিবর্তন ধীরে ধীরে দেখা যাবে। অর্থাৎ আজকের প্রায় সমান দিন-রাত আসলে উত্তর গোলার্ধে দিনের আলো কমে যাওয়ার একটি নতুন পর্যায়ের সূচনা।
প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও আলোর সময়ের কিছুটা প্রভাব পড়ে। দিনের আলো কমতে থাকায় সকাল ও সন্ধ্যার সময়ের আলো ব্যবহারের অভ্যাসেও পরিবর্তন আসে। সকালে কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোয় থাকা, জানালা খোলা রাখা বা বাইরে হাঁটাহাঁটি করা দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হতে পারে। একইভাবে সন্ধ্যার পর ঘুমের প্রস্তুতির সময় নিয়মিত রাখা এবং রাতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই আজকের দিনটি শুধু দিন-রাত প্রায় সমান হওয়ার কারণে বিশেষ নয়। এটি পৃথিবীর কক্ষপথ, সূর্যের আলো এবং ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত একটি মহাজাগতিক মুহূর্ত। আকাশে এর কোনো নাটকীয় পরিবর্তন চোখে না পড়লেও পৃথিবী তার কক্ষপথে চলতে চলতে এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে সূর্যের আলো দুই গোলার্ধে প্রায় সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে।