ঢাকা    রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ ৭ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

এআইয়ের যুগে নিখুঁত সিভিই কেন নিয়োগদাতার সন্দেহ তৈরি করছে?

এআইয়ের যুগে নিখুঁত সিভিই কেন নিয়োগদাতার সন্দেহ তৈরি করছে?
ছবি : সংগৃহীত
ফলো করুন

এক সময় চাকরির জন্য একটি পরিপাটি, ভুলত্রুটিমুক্ত ও পেশাদার জীবনবৃত্তান্তই ছিল প্রার্থীর প্রথম বড় পরিচয়। সঠিক ফরম্যাট, সুন্দর ভাষা, গুছিয়ে লেখা অভিজ্ঞতা এবং প্রাসঙ্গিক দক্ষতা দেখে নিয়োগদাতা প্রার্থী সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতেন। ভালো সিভি দেখলেই ধরে নেওয়া হতো, প্রার্থী অন্তত নিজের কাজ, যোগাযোগ ও পেশাগত উপস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। এখন কয়েক মিনিটের মধ্যে সাধারণ একটি সিভিকে পেশাদার ভাষায় সাজানো যায়, চাকরির বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় কী-ওয়ার্ড যোগ করা যায় এবং একই সঙ্গে কভার লেটারও তৈরি করা সম্ভব। ফলে এখন একটি ঝকঝকে সিভি দেখলেই প্রার্থীর প্রকৃত দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

গার্টনারের জরিপে ৩ হাজার ২৯০ জন চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে ৩৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা চাকরির আবেদনপ্রক্রিয়ায় কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করেছেন। এআই ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ সিভি বা জীবনবৃত্তান্তের লেখা তৈরিতে এবং ৫০ শতাংশ কভার লেটার লেখার কাজে এআই ব্যবহার করেছেন।

এআই ব্যবহারের ফলে চাকরির আবেদনের সংখ্যা বেড়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে একই ধরনের ভাষা ও কাঠামোয় তৈরি আবেদনের সংখ্যা। নিয়োগদাতারা এখন প্রায়ই এমন সিভি পাচ্ছেন, যেখানে চাকরির বিজ্ঞপ্তির প্রতিটি চাহিদার সঙ্গে ভাষাগত মিল আছে, কিন্তু প্রার্থীর বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা কতটা, তা বোঝা কঠিন।

রবার্ট হাফের এক গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের কারণে সিভির তথ্য যাচাই এখন নিয়োগদাতাদের জন্য আরও জটিল হয়ে উঠেছে। চাকরির বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে পুরো আবেদনকে খুব নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দেওয়া গেলেও প্রার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতা, কাজের ধরন এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা সিভি দেখে সব সময় বোঝা যায় না।

নিয়োগদাতাদের সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে কয়েকটি বিষয়। যেমন—একই ধরনের বাক্য, অতিরিক্ত পরিশীলিত করপোরেট ভাষা, প্রার্থীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে সিনিয়র শোনানো বর্ণনা এবং এমন কিছু দক্ষতার উল্লেখ, যা সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এআই দিয়ে লেখা তথ্য দেখতে আকর্ষণীয় হলেও তা যদি প্রার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে না মেলে, তাহলে সাক্ষাৎকার, লিংকডইন প্রোফাইল যাচাই বা রেফারেন্স যাচাইয়ে অসামঞ্জস্য ধরা পড়তে পারে।

এ কারণে সিভির গুরুত্ব একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে না, তবে এর ভূমিকা বদলে যাচ্ছে। Criteria Corp ও Lighthouse Research & Advisory-এর প্রায় এক হাজার নিয়োগকারী নেতার ওপর করা জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নিয়োগদাতা মনে করেন সিভি প্রার্থীর প্রকৃত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন। তারপরও দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক বাছাইয়ের প্রথম ধাপ হিসেবে সিভি ব্যবহার করে।

এই বাস্তবতায় চাকরিপ্রার্থীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা, বিকল্প হিসেবে নয়। সিভি তৈরিতে এআই দিয়ে ভাষা ঠিক করা, বানান সংশোধন করা কিংবা তথ্য গুছিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তবে যেসব তথ্য দেওয়া হবে, প্রতিটি তথ্য যেন নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও অর্জনের সঙ্গে মেলে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

একটি কার্যকর সিভিতে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, নির্দিষ্ট উদাহরণ, পরিমাপযোগ্য ফলাফল এবং নিজের স্বাভাবিক ভাষা থাকা জরুরি। শুধু ‘দক্ষতা বাড়িয়েছি’ বলার বদলে কোন কাজ করে, কত সময়ে, কী ফল পাওয়া গেছে—তা উল্লেখ করলে আবেদন বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়। বিক্রয় বৃদ্ধি, খরচ কমানো, সময় বাঁচানো, প্রকল্প সম্পন্ন করা বা নির্দিষ্ট সংখ্যক গ্রাহক সামলানোর মতো তথ্য সিভিকে শক্তিশালী করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন কোনো দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা সিভিতে যোগ করা যাবে না, যা সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এআইয়ের যুগে নিয়োগদাতারা শুধু ভালো লেখা নয়, প্রার্থীর সত্যতা, কাজের প্রমাণ এবং নিজের ভাষায় অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করার সক্ষমতাকেও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

ট্যাগ : এআই সিভি চাকরির বাজার জীবনবৃত্তান্ত

বাংলা ভিউজ

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


এআইয়ের যুগে নিখুঁত সিভিই কেন নিয়োগদাতার সন্দেহ তৈরি করছে?

প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

এক সময় চাকরির জন্য একটি পরিপাটি, ভুলত্রুটিমুক্ত ও পেশাদার জীবনবৃত্তান্তই ছিল প্রার্থীর প্রথম বড় পরিচয়। সঠিক ফরম্যাট, সুন্দর ভাষা, গুছিয়ে লেখা অভিজ্ঞতা এবং প্রাসঙ্গিক দক্ষতা দেখে নিয়োগদাতা প্রার্থী সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতেন। ভালো সিভি দেখলেই ধরে নেওয়া হতো, প্রার্থী অন্তত নিজের কাজ, যোগাযোগ ও পেশাগত উপস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন।

কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারে সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে। এখন কয়েক মিনিটের মধ্যে সাধারণ একটি সিভিকে পেশাদার ভাষায় সাজানো যায়, চাকরির বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় কী-ওয়ার্ড যোগ করা যায় এবং একই সঙ্গে কভার লেটারও তৈরি করা সম্ভব। ফলে এখন একটি ঝকঝকে সিভি দেখলেই প্রার্থীর প্রকৃত দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

গার্টনারের জরিপে ৩ হাজার ২৯০ জন চাকরিপ্রার্থীর মধ্যে ৩৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা চাকরির আবেদনপ্রক্রিয়ায় কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করেছেন। এআই ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ সিভি বা জীবনবৃত্তান্তের লেখা তৈরিতে এবং ৫০ শতাংশ কভার লেটার লেখার কাজে এআই ব্যবহার করেছেন।

এআই ব্যবহারের ফলে চাকরির আবেদনের সংখ্যা বেড়েছে, একই সঙ্গে বেড়েছে একই ধরনের ভাষা ও কাঠামোয় তৈরি আবেদনের সংখ্যা। নিয়োগদাতারা এখন প্রায়ই এমন সিভি পাচ্ছেন, যেখানে চাকরির বিজ্ঞপ্তির প্রতিটি চাহিদার সঙ্গে ভাষাগত মিল আছে, কিন্তু প্রার্থীর বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা কতটা, তা বোঝা কঠিন।

রবার্ট হাফের এক গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের কারণে সিভির তথ্য যাচাই এখন নিয়োগদাতাদের জন্য আরও জটিল হয়ে উঠেছে। চাকরির বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে পুরো আবেদনকে খুব নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দেওয়া গেলেও প্রার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতা, কাজের ধরন এবং সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা সিভি দেখে সব সময় বোঝা যায় না।

নিয়োগদাতাদের সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে কয়েকটি বিষয়। যেমন—একই ধরনের বাক্য, অতিরিক্ত পরিশীলিত করপোরেট ভাষা, প্রার্থীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে সিনিয়র শোনানো বর্ণনা এবং এমন কিছু দক্ষতার উল্লেখ, যা সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করা কঠিন। এআই দিয়ে লেখা তথ্য দেখতে আকর্ষণীয় হলেও তা যদি প্রার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে না মেলে, তাহলে সাক্ষাৎকার, লিংকডইন প্রোফাইল যাচাই বা রেফারেন্স যাচাইয়ে অসামঞ্জস্য ধরা পড়তে পারে।

এ কারণে সিভির গুরুত্ব একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে না, তবে এর ভূমিকা বদলে যাচ্ছে। Criteria Corp ও Lighthouse Research & Advisory-এর প্রায় এক হাজার নিয়োগকারী নেতার ওপর করা জরিপে দেখা গেছে, মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নিয়োগদাতা মনে করেন সিভি প্রার্থীর প্রকৃত দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন। তারপরও দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক বাছাইয়ের প্রথম ধাপ হিসেবে সিভি ব্যবহার করে।

এই বাস্তবতায় চাকরিপ্রার্থীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা, বিকল্প হিসেবে নয়। সিভি তৈরিতে এআই দিয়ে ভাষা ঠিক করা, বানান সংশোধন করা কিংবা তথ্য গুছিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তবে যেসব তথ্য দেওয়া হবে, প্রতিটি তথ্য যেন নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও অর্জনের সঙ্গে মেলে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

একটি কার্যকর সিভিতে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা, নির্দিষ্ট উদাহরণ, পরিমাপযোগ্য ফলাফল এবং নিজের স্বাভাবিক ভাষা থাকা জরুরি। শুধু ‘দক্ষতা বাড়িয়েছি’ বলার বদলে কোন কাজ করে, কত সময়ে, কী ফল পাওয়া গেছে—তা উল্লেখ করলে আবেদন বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়। বিক্রয় বৃদ্ধি, খরচ কমানো, সময় বাঁচানো, প্রকল্প সম্পন্ন করা বা নির্দিষ্ট সংখ্যক গ্রাহক সামলানোর মতো তথ্য সিভিকে শক্তিশালী করে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন কোনো দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা সিভিতে যোগ করা যাবে না, যা সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এআইয়ের যুগে নিয়োগদাতারা শুধু ভালো লেখা নয়, প্রার্থীর সত্যতা, কাজের প্রমাণ এবং নিজের ভাষায় অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করার সক্ষমতাকেও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ