ঢাকার সাভারে মাদ্রাসার এক শিশু শিক্ষার্থীকে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ১০ আসামির মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে বরিশালের বেতাগী এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সামরুল হাসান।
তিনি বলেন, মামলার ১০ আসামির মধ্যে দুই নম্বর আসামিকে বরিশালের বেতাগী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলায় তার বয়স ২২ বছর উল্লেখ করা হলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন কিশোর। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বয়স ১৩ থেকে ১৪ বছর হতে পারে।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের দুটি দল কাজ করছে। তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরেই মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে সাভারের পূর্ব শাহীবাগ এলাকায় অবস্থিত জিয়া বিন কাসেম পরিচালিত মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়েছিল পুলিশ। দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত চলা ওই অভিযানে মামলার ১০ আসামির কাউকেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে ওই অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পরই বরিশালের বেতাগী থেকে মামলার একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সাভার মডেল থানার পরিদর্শক মো. আব্দুস সবুরের নেতৃত্বে পুলিশের দুটি দল মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসায় যায়। সেখানে উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশ সদস্যরা। পাশাপাশি মামলার আসামি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নথিপত্রও যাচাই করা হয়।
এ সময় মাদ্রাসায় উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পুলিশকে জানান, মামলার অভিযুক্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সেখানে নেই এবং তারা পলাতক রয়েছেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও আসামিদের কাউকে না পেয়ে পুলিশের দলটি মাদ্রাসা থেকে ফিরে আসে।
অভিযানে অংশ নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে ওই দিন বিকেলে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপারেশন ও ট্রাফিক-উত্তর) মো. জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন, ভুক্তভোগীর পরিবার প্রথমে থানায় আসেনি। তারা আদালতে যাওয়ার পর আদালতের নির্দেশে সাভার মডেল থানায় মামলাটি করা হয়।
তিনি বলেন, মামলা হওয়ার পরপরই আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করতে একাধিক সূত্র থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার মাদ্রাসায় পরিচালিত অভিযানে আসামিদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। খুব দ্রুতই তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
যেভাবে মামলা
এর আগে শিশুটিকে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তার বাবা। এ ঘটনায় গত ২৬ আগস্ট আদালতের নির্দেশে সাভার মডেল থানায় মামলা করেন তিনি।
মামলায় সাভারের পূর্ব শাহীবাগ এলাকায় অবস্থিত মারকাযুল উলুম আশ-শরইয়্যাহ মাদ্রাসার ছয় শিক্ষার্থী ও চার শিক্ষকসহ মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচ শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশুটিকে ধর্ষণের সরাসরি অভিযোগ আনা হয়েছে। অপর চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণে সহযোগিতা, অভিযুক্তদের পালিয়ে যেতে সহায়তা এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
শিশুটির বাবার অভিযোগ
আসামিদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় বৃহস্পতিবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন শিশুটির বাবা। সাভার মডেল থানায় সাংবাদিকদের কাছে তিনি অভিযোগ করেন, তার ছেলেকে দীর্ঘ ছয় মাস ধরে ৬-৭ জন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মিলে ধর্ষণ করেছে। এতে তার ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি মাদ্রাসার প্রধানের কাছে বিচার চেয়েছিলেন। তবে অপরাধীদের আইনের হাতে তুলে না দিয়ে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকতে তাকে বলা হয়েছিল এবং পরে হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শিশুটির বাবা বলেন, চিকিৎসা শেষে ছেলেকে নিয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন। পরে আদালতের নির্দেশে সাভার থানায় মামলা করা হয়। মামলায় মাদ্রাসার প্রধানসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর পুলিশ মাদ্রাসায় অভিযান চালালেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। তার দাবি, মামলার সব আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বক্তব্য
এদিকে মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘটনাটিকে অত্যন্ত নিন্দনীয় উল্লেখ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে নিরপরাধ শিক্ষার্থী বা শিক্ষককে যেন হয়রানি করা না হয়, সে বিষয়েও তারা সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
তাদের দাবি, মামলায় অভিযুক্ত পাঁচ শিক্ষার্থীর বয়স ১৩ বছর বা তার কম।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মাদ্রাসাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও হিসাবরক্ষক লোকমান বলেন, কেউ কোনো অন্যায় বা অপরাধ করে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে ওই ব্যক্তির শাস্তি হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, তাবলিগের সাথী হিসেবে শিশুটির বাবার সঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল। কয়েকবার তার সঙ্গে কথা বলা হলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরে তাকে থানায় মামলা করতে বলা হয় এবং সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
লোকমান আরও বলেন, সাংবাদিকেরা গত কয়েকদিন ধরে মাদ্রাসায় আসছেন এবং তাদের চাওয়া তথ্য দেওয়া হচ্ছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও চায়, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসুক এবং প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হোক।
তদন্ত অব্যাহত
মামলার এক আসামি গ্রেপ্তারের পর এখন বাকি নয় আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং পুলিশের দুটি দল এ বিষয়ে কাজ করছে।
এদিকে মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামির প্রকৃত বয়স নিয়েও নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এজাহারে তার বয়স ২২ বছর উল্লেখ থাকলেও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, তিনি কিশোর এবং তার বয়স ১৩ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। ফলে তার বয়স যাচাইয়ের বিষয়টিও মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মন্তব্যসমূহ