ঢাকা    বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

ট্রাম্পের নীতিতে বদলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্ক

ট্রাম্পের নীতিতে বদলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্ক
ফাইল ছবি
ফলো করুন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত দুই দেশের সম্পর্ক এখন বাণিজ্য বিরোধ, শুল্ক আরোপ এবং ক্রমবর্ধমান মার্কিনবিরোধী মনোভাবের কারণে চাপে পড়েছে।

বিশ্বের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নাগরিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ ছিল। সীমান্তটিও মূলত সামরিকীকরণমুক্ত। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর কানাডায় মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে শুরু করে।

ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার প্রস্তাব দেন। কানাডার সরকার, বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বক্তব্য ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র হয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির জবাবে গত বছরের মার্চে কানাডাও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকার মার্কিন অ্যালকোহল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। পরে কিছু ক্ষেত্রে পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও অধিকাংশ প্রদেশে মার্কিন মদ ও অন্যান্য অ্যালকোহলিক পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।

কানাডার ১৩টি প্রদেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১১টিতে দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন অ্যালকোহল বর্জনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে দেশটির অনেক দোকানের তাক থেকে মার্কিন মদ ও ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন প্রায় পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কানাডায় মার্কিন অ্যালকোহল আমদানি প্রায় ৮১ শতাংশ কমে গেছে বলে সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সাধারণ কানাডীয়দের মধ্যেও মার্কিন পণ্য বর্জনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অনেক ভোক্তা মার্কিন মদ, কফি ও অন্যান্য পণ্যের পরিবর্তে কানাডায় তৈরি পণ্য কিনছেন। পণ্যের উৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ক্রেতাদের আগ্রহও বেড়েছে।

দুই দেশের মধ্যে নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি চুক্তির কিছু শর্ত এবং শেষ মুহূর্তের পরিবর্তনকে দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগজনক মনে করে আলোচনা বাতিল করেন। এরপর ট্রাম্প কানাডার পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। জবাবে কানাডাও মার্কিন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করে।

কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন জনগণকে নিজেদের দেশের পণ্য কেনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা তাদের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি এবং কানাডীয় পণ্য বেছে নেওয়ার মাধ্যমে তারা দেশের অর্থনীতিকে সমর্থন করতে পারেন।

শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলিও কানাডীয় পণ্য কেনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, স্থানীয় পণ্য বেছে নেওয়া হলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে, অন্যদিকে দেশের কর্মসংস্থান রক্ষা করা সম্ভব হবে।

মন্ট্রিলের ব্যবসায়ীরাও ভোক্তাদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন। স্থানীয় এক সুপারমার্কেটের ব্যবস্থাপক জানান, ক্রেতারা এখন পণ্যের উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে চাইছেন এবং তুলনামূলক বেশি দাম হলেও কুইবেকের তৈরি পণ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

গত বছর থেকে কানাডার বিভিন্ন দোকানে পণ্যের উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং কানাডার পতাকার ম্যাপেল পাতার প্রতীক ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। অনেক ব্যবসায়ীও স্থানীয় পণ্য কেনার প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।

এই অর্থনৈতিক দেশপ্রেমের প্রভাব পর্যটন খাতেও পড়েছে। অনেক কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে কানাডীয় পর্যটকদের ভ্রমণ প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল।

কানাডীয় পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী কয়েকটি অঙ্গরাজ্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য ‘নিউইয়র্ক লাভস কানাডা’ নামে একটি প্রচারণা চালু করেছে, যার আওতায় বছরের শেষ পর্যন্ত কানাডীয় পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা ও ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, বিচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক বা পর্যটন উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হওয়া দূরত্ব দ্রুত কমানো কঠিন। দীর্ঘদিনের মিত্রদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

ট্যাগ : ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র কানাডা

মন্তব্যসমূহ

মন্তব্য লোড হচ্ছে…

আপনার মন্তব্য লিখুন

মন্তব্য অনুমোদনের পরে প্রকাশিত হবে।
ব্যক্তিগত তথ্য বা আপত্তিকর লেখা দেবেন না।

আপনার মন্তব্য জমা হয়েছে

মন্তব্যটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পর এটি প্রকাশিত হবে।

বাংলা ভিউজ

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬


ট্রাম্পের নীতিতে বদলে গেছে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্ক

প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত দুই দেশের সম্পর্ক এখন বাণিজ্য বিরোধ, শুল্ক আরোপ এবং ক্রমবর্ধমান মার্কিনবিরোধী মনোভাবের কারণে চাপে পড়েছে।

বিশ্বের দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নাগরিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ ছিল। সীমান্তটিও মূলত সামরিকীকরণমুক্ত। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর কানাডায় মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়তে শুরু করে।

ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার প্রস্তাব দেন। কানাডার সরকার, বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বক্তব্য ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ আরও তীব্র হয়।

ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির জবাবে গত বছরের মার্চে কানাডাও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন প্রাদেশিক সরকার মার্কিন অ্যালকোহল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। পরে কিছু ক্ষেত্রে পাল্টা শুল্ক প্রত্যাহার করা হলেও অধিকাংশ প্রদেশে মার্কিন মদ ও অন্যান্য অ্যালকোহলিক পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।

কানাডার ১৩টি প্রদেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ১১টিতে দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন অ্যালকোহল বর্জনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে দেশটির অনেক দোকানের তাক থেকে মার্কিন মদ ও ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন প্রায় পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কানাডায় মার্কিন অ্যালকোহল আমদানি প্রায় ৮১ শতাংশ কমে গেছে বলে সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে।

বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সাধারণ কানাডীয়দের মধ্যেও মার্কিন পণ্য বর্জনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অনেক ভোক্তা মার্কিন মদ, কফি ও অন্যান্য পণ্যের পরিবর্তে কানাডায় তৈরি পণ্য কিনছেন। পণ্যের উৎপত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ক্রেতাদের আগ্রহও বেড়েছে।

দুই দেশের মধ্যে নতুন একটি বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি চুক্তির কিছু শর্ত এবং শেষ মুহূর্তের পরিবর্তনকে দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য উদ্বেগজনক মনে করে আলোচনা বাতিল করেন। এরপর ট্রাম্প কানাডার পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। জবাবে কানাডাও মার্কিন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করে।

কানাডার অর্থমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন জনগণকে নিজেদের দেশের পণ্য কেনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা তাদের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তি এবং কানাডীয় পণ্য বেছে নেওয়ার মাধ্যমে তারা দেশের অর্থনীতিকে সমর্থন করতে পারেন।

শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলিও কানাডীয় পণ্য কেনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, স্থানীয় পণ্য বেছে নেওয়া হলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে, অন্যদিকে দেশের কর্মসংস্থান রক্ষা করা সম্ভব হবে।

মন্ট্রিলের ব্যবসায়ীরাও ভোক্তাদের আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করছেন। স্থানীয় এক সুপারমার্কেটের ব্যবস্থাপক জানান, ক্রেতারা এখন পণ্যের উৎপত্তি সম্পর্কে জানতে চাইছেন এবং তুলনামূলক বেশি দাম হলেও কুইবেকের তৈরি পণ্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

গত বছর থেকে কানাডার বিভিন্ন দোকানে পণ্যের উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং কানাডার পতাকার ম্যাপেল পাতার প্রতীক ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। অনেক ব্যবসায়ীও স্থানীয় পণ্য কেনার প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।

এই অর্থনৈতিক দেশপ্রেমের প্রভাব পর্যটন খাতেও পড়েছে। অনেক কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ না করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে কানাডীয় পর্যটকদের ভ্রমণ প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল।

কানাডীয় পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তবর্তী কয়েকটি অঙ্গরাজ্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য ‘নিউইয়র্ক লাভস কানাডা’ নামে একটি প্রচারণা চালু করেছে, যার আওতায় বছরের শেষ পর্যন্ত কানাডীয় পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা ও ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, বিচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক বা পর্যটন উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কে তৈরি হওয়া দূরত্ব দ্রুত কমানো কঠিন। দীর্ঘদিনের মিত্রদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায় থেকে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ