ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার তাওহীদ ইসলামই গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আলোচিত রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস। সম্প্রতি মানি লন্ডারিং মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার পরিচয়, সম্পদের উৎস এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
তাওহীদ ইসলাম ফুলবাড়িয়া উপজেলার ছাইতানতলা এলাকার সবজি বিক্রেতা রফিকুল ইসলামের মেয়ে স্মৃতি আক্তারের স্বামী। একসময় তিনি ওই এলাকায় একটি দৃষ্টিনন্দন বাড়িনির্মান করে বসবাস করতেন।
বাড়ির নাম দেন মাশাল্লাহ মঞ্জিল’।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছরের ব্যবধানে তার জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে এবং বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন তিনি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্মজীবনের শুরুতে রাজধানীর উত্তরায় পুরনো এয়ার কন্ডিশনার (এসি) কেনাবেচা, মেরামত ও ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন তাওহীদ ইসলাম। পরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিচয় ব্যবহার করে চাকরি, বদলি, টেন্ডার এবং সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
জানা যায়, ২০১৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তিনি ‘তাওহীদ ইসলাম’ নাম ব্যবহার শুরু করেন। একই বছর ফুলবাড়িয়ার স্মৃতি আক্তারকে বিয়ে করেন। এরপর স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড, দরিদ্রদের সহায়তা এবং প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি ঘর, নলকূপসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শত শত মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেন তিনি। এছাড়া চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বহু মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এর আগে ২০২২ সালের ৮ নভেম্বর জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র্যাবের যৌথ অভিযানে প্রতারণার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, তিনি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা করে আসছিলেন। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
প্রতারণার অভিযোগের পাশাপাশি তার সম্পদের উৎস নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে ফুলবাড়িয়ার বালিয়ান এলাকায় প্রায় ১৩ শতাংশ জমি কিনে পাশের সরকারি খাস জমি ও খাল দখল করে বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারতলা ভবনটি প্রথমে চিকিৎসালয় করার কথা বলা হলেও পরে সেখানে সুইমিংপুল, কটেজ ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে এটি ‘প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক’ নামে পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে তাদের মামলা-মোকদ্দমার ভয় দেখিয়ে হুমকি দেওয়া হতো। পরে পাওনাদারদের চাপ বাড়তে থাকলে তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যান। বর্তমানে ফুলবাড়িয়ায় প্রতারিত বলে দাবি করা লোকজন তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। তারা টাকা ফেরত এবং তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সর্বশেষ গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ থেকে ৮২ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে আবারও আলোচনায় আসেন তাওহীদ ইসলাম ওরফে হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস। এ ঘোষণা ঘিরে স্থানীয়ভাবে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি কর্মসূচি পালিত হয়। পরে মন্দির কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের কাজ স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়।
গত ১২ জুলাই দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্যরামচন্দ্রপুর এলাকার শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ ও কালীমন্দির এলাকা থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর একটি বিশেষ দল তাকে মানি লন্ডারিং মামলায় গ্রেপ্তার করে। পরে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলায় তাকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়।
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, তার ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাব ঘুরে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
বর্তমানে সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট তার নামে ও বেনামে থাকা ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, বিভিন্ন বিনিয়োগ, জমি, রিসোর্ট ও অন্যান্য সম্পদের বৈধতা যাচাই করছে। একই সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এদিকে, সম্প্রতি ময়মনসিংহের একটি চেক জালিয়াতি মামলায় এক বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে তাওহীদ ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতে বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বা তার আইনজীবীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।