দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে একপাক্ষিক, অতিরঞ্জিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ। এ ধরনের প্রচারণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি গণমাধ্যমের প্রতি তথ্য যাচাই করে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাংলাদেশ মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি শায়েখ আবদুল হক, সিনিয়র সহসভাপতি শায়েখ নেছার আহমদ আন নাছিরী, সাধারণ সম্পাদক শায়েখ সাদ সাইফুল্লাহ মাদানী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি আবদুল কাইয়ুম মোল্লা যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে নেতারা বলেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে অপরাধ সংঘটিত হলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার দায় পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দিয়ে কোটি মানুষের আস্থার এ প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। এমন প্রবণতা সত্যনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
তারা দেশের গণমাধ্যমকে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দেশের সব মাদরাসার মুহতামিম, পরিচালক ও শিক্ষকদের প্রতি সাত দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাত দফা আহ্বান
১. প্রতিটি মাদরাসাকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
২. শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগে নৈতিকতা, যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে দেশব্যাপী বয়কট করতে হবে। প্রয়োজনে তার পরিচয় প্রকাশ করা হবে, যাতে তিনি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব নিতে না পারেন।
৩. শিক্ষক ও কর্মীদের নৈতিকতা, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থী ব্যবস্থাপনা এবং শিশু সুরক্ষা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করবে।
৪. স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দায়িত্বশীল সাংবাদিক এবং সচেতন সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। মাদরাসার নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে তাদের গঠনমূলক পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।
৫. শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, পরামর্শ ও সমস্যার কথা নিরাপদে জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারেন।
৬. শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক পরিপক্বতা বিবেচনায় শ্রেণি ও আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। ছোট ও বড় শিক্ষার্থীদের অনুপযুক্তভাবে একসঙ্গে রাখা যাবে না। কোনো শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৭. শিক্ষার্থীদের প্রতি সদাচরণ, সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। শাসনের নামে অপমান, নির্যাতন বা অমানবিক আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং তাদের মানসিক সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।
নেতারা বলেন, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন, জবাবদিহিমূলক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমেই মাদরাসা শিক্ষার মর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা এবং মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
এর আগে মাদরাসা শিক্ষার মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ঐতিহ্য রক্ষা এবং এ শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ মাদরাসা সংরক্ষণ পরিষদ আত্মপ্রকাশ করে। সংগঠনটি ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের জন্য ৫১ সদস্যবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠাকালীন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর লালবাগে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কমিটি ঘোষণা করেন সভাপতি শায়েখ আবদুল হক। কমিটিতে সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে শায়েখ নেছার আহমদ আন নাছিরী, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শায়েখ সাদ সাইফুল্লাহ মাদানী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মুফতি আবদুল কাইয়ুম মোল্লাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন মাওলানা যোবায়ের আহমদ। সহসাধারণ সম্পাদক হিসেবে মাওলানা আব্দুর রহমান মৃধা ও মুফতি মাছুম বিল্লাহ মাহমুদী, সহসাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে মাওলানা সালমান রহমান ও মাওলানা জাফর আহমদ মজুমদার দায়িত্ব পেয়েছেন।
কমিটিতে অর্থ সম্পাদক মুফতি জিয়াউর রহমান, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী, সহকারী প্রচার সম্পাদক হাফেজ কারী জসিম উদ্দিন মক্কী, মিডিয়া সম্পাদক হাফেজ মাওলানা উবায়দুল্লাহ, দপ্তর সম্পাদক মাওলানা আমির আহমদ রহমানী, সহকারী দপ্তর সম্পাদক মুফতি তৌহিদুল ইসলাম, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা মাকসুদুল হক মাদানী এবং আইন বিষয়ক সম্পাদক হাফেজ মাওলানা আব্দুল্লাহ হাসান দায়িত্ব পেয়েছেন।
সংগঠনটির নেতারা জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে সহসভাপতি, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এবং ২০ জন নির্বাহী সদস্যসহ মোট ৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে।