কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে নিহত পাঁচ শিক্ষার্থীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেই জানাজা শেষে ৩ ও ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দুটি কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।
এর আগে বুধবার দুপুরে ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-৩ ব্লকে অবস্থিত মসজিদুল কুবা নারী মাদরাসা ও হেফজখানার একটি শ্রেণিকক্ষের ওপর পাহাড় ধসে পড়ে। এতে পাঁচ শিক্ষার্থী নিহত এবং আটজন আহত হয়।
নিহতদের মধ্যে দুই বোন উম্মে নাজাত ও উম্মে সালমাও রয়েছে। তাদের বাবা আব্দুস শুক্কুর মেয়েদের কোরআনের হাফেজ বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে তারা কুতুপালং ৩ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করছিলেন।
আব্দুস শুক্কুর বলেন, দুই মেয়েকে একসঙ্গে মাদরাসায় পাঠিয়েছিলেন। তারা ঘরে ফিরে একসঙ্গে খাবেন—এমন অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু হঠাৎ খবর পান মাদরাসার ওপর পাহাড় ধসে পড়েছে। সেখানে গিয়ে তিনি মেয়েদের মাটির নিচে চাপা অবস্থায় দেখতে পান।
শোকাহত এই বাবা বলেন, এক বৃষ্টির দিনে সন্তানদের কোলে নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন, আর বৃষ্টির দিনেই তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিল। মেয়েদের কোরআনের হাফেজ বানানোর স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
দুর্ঘটনার সময় মাদরাসার ভেতরে অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী পাঠ নিচ্ছিল। প্রাণে বেঁচে যাওয়া শিক্ষিকা বেগম জাহান জানান, শিশুদের কোরআন পড়ানোর সময় বিকট শব্দে পাহাড়ধস হয়। দেয়াল ধসে পড়লে শিক্ষার্থীরা চিৎকার করতে থাকে। পশ্চিম পাশের দরজা খোলা থাকায় কয়েকজন বের হতে পারলেও পূর্ব পাশে থাকা শিশুরা বের হতে পারেনি।
নিহতদের পরিবারের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে নাগরিক সংগঠন আরকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিল। সংগঠনটি বৃষ্টির মৌসুমে রোহিঙ্গাদের সতর্ক ও নিরাপদ স্থানে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
ক্যাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড়ের পাদদেশে মাটি ভরাট করে মাদরাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ঘটনার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সব মাদরাসা ও লার্নিং সেন্টার পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, ক্যাম্পের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আপাতত বন্ধ থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত রোহিঙ্গাদের তালিকা করে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম সাজেদুর রহমান দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ উখিয়ার দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, চুরি বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঠেকাতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
এর আগে গত ৬ জুলাই মধ্যরাতে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ আটজনের মৃত্যু হয়। ভারী বর্ষণের প্রভাবে গত চার দিনে ১৫ রোহিঙ্গাসহ কক্সবাজারে ২২ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।














মন্তব্যসমূহ