মানবপাচারকারীদের দেশ, সমাজ ও জনগণের চরম শত্রু আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সর্বাত্মক প্রতিরোধ ও যুদ্ধ ঘোষণার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো অবস্থাতেই মানবপাচারকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না এবং এদের মূলোৎপাটন করতে হবে, যাতে টেকনাফে যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের মতো আর কোনো তরুণ বা দেশপ্রেমিক সৈনিককে অকালে আত্মাহুতি দিতে না হয়। শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬) দুপুরে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় নিহত সেনাসদস্য তিতাস শেখের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও সমবেদনা জানাতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী প্রায় আধা ঘণ্টা সময় তিতাস শেখের গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করেন। শুরুতে তিনি বাড়ির আঙিনায় স্থানীয় গ্রামবাসী ও শোকার্ত মানুষের সাথে কথা বলেন এবং পরবর্তীতে ঘরের ভেতরে গিয়ে তিতাসের মা রেখা বেগম, বাবা আফজাল শেখ, স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার ও ছোট ভাই আকাশ শেখসহ স্বজনদের পাশে বসে সান্ত্বনা দেন। এরপর তিনি শহীদ সৈনিক তিতাস শেখের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন।
পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে শামা ওবায়েদ বলেন, দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে গিয়ে অসীম সাহসিকতার সাথে লড়াই করে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন শহীদ তিতাস। তিনি উল্লেখ করেন, তিতাস তাঁর নিজের এলাকারই সন্তান এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রধান তারেক রহমানসহ পুরো রাষ্ট্র এই শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে রয়েছে। মানবপাচার কেবল টেকনাফে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে তিনি জানান, ফরিদপুর ও কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় দালাল চক্র সহজ-সরল মানুষকে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে বিদেশে পাঠানোর লোভ দেখিয়ে সর্বস্বান্ত করছে এবং সাগরপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় অনেককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অসাধু চক্রের কারণে বিদেশে কর্মরত লাখ লাখ বৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকের ভাবমূর্তি ও কর্মসংস্থান বিপন্ন হচ্ছে এবং দক্ষ প্রবাসীদের গমনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে তৃণমূল থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত পাচারকারী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে এগোচ্ছে বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রসুল সামদানি আজাদ, নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি হাবিবুর রহমান তালুকদার ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমানসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সুধীজন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তিতাস শেখ সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় তিতাস চার বছর আগে সুমাইয়া আক্তারকে বিয়ে করেন এবং আগামী ডিসেম্বরেই স্ত্রীকে কর্মস্থলে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ৫ নভেম্বর বিকেলে টেকনাফে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনাকালে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গুলিতে বুকের বাম পাশে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। পরে তাঁকে দ্রুত রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত পৌনে ৯টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করা হয়।














মন্তব্যসমূহ