দীর্ঘ নয় মাসের বিরতি কাটিয়ে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনে। পর্যটন মৌসুমের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার ৮৩৭ জন যাত্রী নিয়ে দ্বীপে পৌঁছেছে এমভি বার আউলিয়া। এতে নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে দ্বীপের পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে। দীর্ঘদিন পর পর্যটকদের আগমনে স্বস্তি ও আনন্দ দেখা গেছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটায় কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে জাহাজটি। প্রায় ছয় ঘণ্টার সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে দুপুর দেড়টার দিকে দ্বীপের জেটিঘাটে পৌঁছায় এটি। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম জানান, ৮০০ জনের বেশি পর্যটক নিয়ে এমভি বার আউলিয়া ঘাটে পৌঁছেছে। তাঁদের স্বাগত জানিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। এ সময় পর্যটকদের ওয়ানটাইম প্লাস্টিক ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা হয়। ঘাটে কোস্টগার্ড, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মোহাম্মদ নাহিদ প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিনে গিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, সমুদ্রযাত্রা ছিল দারুণ। দ্বীপে নেমে তাঁর মনে হয়েছে, যেন স্বর্গে এসেছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সেখানে যেতে পেরে তিনি আনন্দিত। দ্বীপে প্রবেশের সময় কিউআর কোড স্ক্যান ও তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থাও তাঁর ভালো লেগেছে। নিরাপত্তা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা দেখে তিনি অভিভূত হয়েছেন।
পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ছিলেন দ্বীপের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। স্থানীয় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী হামিদ হোসেন তাঁদেরই একজন। পর্যটকের অভাবে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছিল তাঁকে। পর্যটকদের ফিরে আসায় বৃহস্পতিবার আবার দোকান খুলেছেন তিনি। হামিদ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ থাকায় সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয়েছে। আজ আবার মানুষের আনাগোনা দেখে দোকান খুলেছেন। তাঁর মনে হচ্ছে, দ্বীপটি আবার বেঁচে উঠেছে। বিষয়টি তাঁদের কাছে ঈদের আনন্দের মতো।
স্থানীয় তরুণ আব্দুর রহমান পড়াশোনার পাশাপাশি পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত। পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে এই পেশায় এলেও পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাঁর সংসারেও আর্থিক টানাপোড়েন দেখা দিয়েছিল। বৃহস্পতিবার পর্যটকদের আগমন শুরু হওয়ায় কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে। এতে জীবিকার পথ আবার সচল হবে বলে আশা করছেন তিনি। তবে পরিবেশ সুরক্ষায় নির্ধারিত নিয়ম কেউ ভঙ্গ করছেন কি না, সেদিকেও নজর রাখছেন তাঁরা।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম অনীক চৌধুরী জানান, দুপুর দেড়টার দিকে জেটিঘাটে পর্যটকদের নামানো শুরু হয়। তাঁদের অভ্যর্থনা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। পর্যটকেরা যাতে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলেন, সে জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁদের কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করার বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে।
সেন্টমার্টিনগামী জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, জাহাজটি নিরাপদে দ্বীপে পৌঁছেছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
স্কোয়াব সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সেন্টমার্টিন রুটে চলাচলের অনুমতি পেয়েছে তিনটি জাহাজ—এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলি ও এমভি টেকনাফ। এগুলোর সম্মিলিত যাত্রী ধারণক্ষমতা ২ হাজার ২৯৮ জন। এর মধ্যে এমভি বার আউলিয়ার ধারণক্ষমতা ৮৫০, এমভি কর্ণফুলির ৭৩২ এবং এমভি টেকনাফের ৭১৬ জন।
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য সেন্টমার্টিন উন্মুক্ত থাকবে। এ সময়ে দ্বীপে ভ্রমণের পাশাপাশি সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটকের রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্রতিদিনও সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক সেখানে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। দ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রত্যেক পর্যটককে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি দিতে হবে। পাশাপাশি ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোডযুক্ত টিকিট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দ্বীপে একাধিক বিধিনিষেধ কার্যকর রয়েছে। রাতে সৈকত ও আশপাশের এলাকায় আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দ সৃষ্টি এবং বারবিকিউ পার্টির আয়োজন করা যাবে না। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ ও কেনাবেচাও নিষিদ্ধ। এ ছাড়া সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, তারামাছ, রাজকাঁকড়া, সামুদ্রিক ঘাস ও শৈবালসহ দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়, এমন কর্মকাণ্ডেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
দীর্ঘদিন পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ও পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পরিবেশ সংরক্ষণের নিয়ম মেনে পর্যটন কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে দ্বীপের মানুষের জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।














মন্তব্যসমূহ