দুই কোরিয়াকে বিভক্তকারী সংবেদনশীল অসামরিক অঞ্চল বা ডিমিলিটারাইজড জোনে (ডিএমজেড) উত্তর কোরিয়া তাদের সামরিক শক্তি ও দূরপাল্লার গোলান্দাজ বাহিনীর সরঞ্জাম জোরদার করায় সীমান্ত পর্যটনকেন্দ্রে আসা স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকদের মাঝে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিনজন সেনাসদস্য আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিউল ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। সিউল এ ঘটনার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানালেও পিয়ংইয়ং তা সম্পূর্ণ ‘মনগড়া গল্প’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। এর পরপরই উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং সীমান্তজুড়ে সিউলবিরোধী প্রচারণামূলক লাউডস্পিকার পুনরায় বসানো এবং কঠোর পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দেন।
উত্তেজনার ধারাবাহিকতায় গত শুক্রবার সীমান্তে প্রথম একটি সাঁজোয়া যান মোতায়েন হতে দেখা যায়। তবে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, সোমবার নাগাদ সীমানার ঠিক ওপারে দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে সরাসরি তাক করে অন্তত তিনটি আর্মার্ড ভেহিকেল বা দূরপাল্লার সাঁজোয়া হাউইটজার কামান সার্বক্ষণিক প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গিমপো এলাকায় অবস্থিত ‘এগিবং অবজারভেটরি’ থেকে মাত্র ১ দশমিক ৪ কিলোমিটার দূরে উত্তর কোরিয়ার কাপুং কাউন্টি খালি চোখেই স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সেখান থেকে পর্যটকেরা সরাসরি এই সামরিক প্রস্তুতি প্রত্যক্ষ করছেন। পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে আসা দর্শনার্থী ও বিদেশি পর্যটকেরা জানিয়েছেন, সীমানার ঠিক ওপারে এমন সক্রিয় যুদ্ধাস্ত্র সরাসরি দেখে এলাকাটিতে চরম থমথমে পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা এসব ভারী অস্ত্রকে উত্তর কোরিয়ার ১২২ মিলিমিটার ক্যালিবারের ‘সেলফ-প্রোপেল্ড হাউইটজার’ কামান হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যা মূলত ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে তাদের সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হয়েছিল। সিউলের আসান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের সামরিক বিশেষজ্ঞ ইয়াং উক জানান, এই কামানগুলোর সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ২৪ কিলোমিটার (১৫ মাইল)। ফলে সীমান্তঘেঁষা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও পার্শ্ববর্তী গিমপো শহর সরাসরি এর আঘাতের আওতায় পড়ে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রের আধুনিক কৌশলের চেয়ে এটি মূলত প্রতিপক্ষকে প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই মোতায়েন করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের (জেসিএস) মুখপাত্র জ্যাং দো-ইয়ং এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক সময়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বড়াই করলেও সীমান্তে দৃশ্যমান এসব কামান তাদের পুরোনো প্রথাগত সামরিক কাঠামোরই অংশ। কৌশলগত দিক থেকে নতুন কোনো চমক না থাকলেও, সীমান্তে ভারী অস্ত্র এভাবে প্রকাশ্যে এনে সাজিয়ে রাখা দুই দেশের মধ্যকার শান্তি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতিকেই স্পষ্ট করে তুলছে।
সূত্র: রয়টার্স
মন্তব্যসমূহ