যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ইরান। তেহরানের অভিযোগ, চলমান সংঘাত নিরসনে ওয়াশিংটন আন্তরিক অবস্থান দেখাচ্ছে না। এর মধ্যেই ইরাকের উপকূলে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে এ ঘটনা ঘটল।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) আল জাজিরার লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে ইরানের সংশয় অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রমবিষয়ক সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ইরাকের আল-ফাও থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ৬৩ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ১১৭ কিলোমিটার দূরে একটি জাহাজে আগুন লেগেছে।
তবে জাহাজটিতে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, সেটি হামলার শিকার হয়েছে কি না কিংবা এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা প্রতিবেদনের প্রাথমিক তথ্যে নিশ্চিত করা হয়নি।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও দুই দেশের অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
তেহরানের অভিযোগ, ওয়াশিংটন শান্তি আলোচনার বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক নয়। অন্যদিকে নতুন করে মার্কিন সামরিক অভিযানের আশঙ্কার মধ্যে ইরানের কর্মকর্তারা পাল্টা প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরে (আইআরজিসি) নিযুক্ত প্রতিনিধি আবদুল্লাহ হাজি সাদেঘি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নিলে আগের চেয়ে আরও কঠোর ও বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে।
ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিমের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, হাজি সাদেঘি দাবি করেছেন, শত্রুপক্ষের দুর্বলতাগুলো সম্পর্কে তেহরান অবগত রয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, সামরিক ক্ষেত্রে সফল হতে না পেরে প্রতিপক্ষ এখন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের সমাজে হতাশা ও বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) ইরানের রাজধানী তেহরানে দেশ তিনটির জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা ইরানি নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন।
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মধ্যে ছিলেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন।
ইরানের পক্ষে বৈঠকে অংশ নেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক প্রধান মহসেন রেজায়ি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
আলোচনায় ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়গুলো উঠে আসে।
বৈঠকে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে সম্মতি হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কিংবা পরবর্তী বৈঠকের নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
মহসেন রেজায়ি বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। একই সঙ্গে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়াই আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে ইরানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক দেশগুলোকেই নিজেদের নিরাপত্তাকাঠামো নির্ধারণের দায়িত্ব নিতে হবে।
ওমানের এই অবস্থান এমন সময়ে সামনে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চললেও নতুন সংঘাতের আশঙ্কা দূর হয়নি।
এদিকে সৌদি আরবে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা সতর্কতা পুনর্ব্যক্ত করেছে রিয়াদে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস।
গত ২৩ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী, জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন এমন সরকারি কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সৌদি আরব ছাড়তে বলা হয়েছিল। মঙ্গলবার সেই নির্দেশের কথা আবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
দূতাবাস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হুতি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় আরও হামলা, আকাশসীমা বন্ধ হওয়া এবং ফ্লাইট বাতিলের ঝুঁকি রয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দাবি, দেশটির পূর্বাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া হুতিদের তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দক্ষিণাঞ্চল অভিমুখে আসা চারটি ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
অন্যদিকে মঙ্গলবার সৌদি আরবের নাজরান শহরে সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় সাময়িক সতর্কতা জারি করে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ। পরে সংস্থাটি জানায়, বিপদ কেটে গেছে।
ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
অন্যদিকে মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, নতুন করে পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাত ঠেকাতে কায়রো প্রতিদিন তেহরান, ওয়াশিংটন এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
এ অবস্থায় ইরাকের উপকূলে জাহাজে আগুন লাগার ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান নিরাপত্তা উদ্বেগকে আরও সামনে এনেছে।
তবে জাহাজে আগুন লাগার সঙ্গে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সরাসরি কোনো সম্পর্ক এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
একদিকে চার দেশের কূটনৈতিক আলোচনা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের অসন্তোষ ও সামরিক হুঁশিয়ারির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
সূত্র: আল জাজিরা।
মন্তব্যসমূহ