বিশ্বজুড়ে উৎপাদিত প্রতি পাঁচ থালা খাবারের প্রায় এক থালাই কোনো না কোনোভাবে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। বছরে এভাবে ডাস্টবিনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রায় ১০৫ কোটি টন খাদ্য। অথচ এর বিপরীতে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকট ও অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন, অর্থাৎ বিশ্বের প্রতি ১৩ জনের একজন নিয়মিত প্রয়োজনীয় খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। খাদ্যের এমন বিপুল অপচয় এবং অনাহারকবলিত মানুষের নির্মম বাস্তবতাকে সামনে রেখে আজ ১৬ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব খাদ্য দিবস।
১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। এবারের খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘আজই উদ্ভাবন, আগামীর পুষ্টি’। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশদ প্রতিবেদনে বৈশ্বিক ক্ষুধা পরিস্থিতি এবং খাদ্য অপচয়ের এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
জাতিসংঘের ‘বিশ্বে খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির পরিস্থিতি’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনা মহামারির তুলনায় সামগ্রিক ক্ষুধার হার কিছুটা কমলেও সংকট এখনো উদ্বেগজনক। ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় অর্ধেকই বাস করেন আফ্রিকায়, যেখানে প্রায় ৩০ কোটি ৯০ লাখ মানুষ অপুষ্টির শিকার। এ ছাড়া এশিয়ায় প্রায় ২৯ কোটি ২০ লাখ মানুষ অপুষ্টির সঙ্গে লড়াই করছেন। ২০২৬ সালের গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স অনুযায়ী বিশ্বের আটটি দেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক, যার শীর্ষে রয়েছে সোমালিয়া। এর পরপরই কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, চাদ, মাদাগাস্কার, সুদান ও ইয়েমেনের অবস্থান।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) তথ্যমতে, খামার থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে এবং খাদ্য গ্রহণের সময় বিপুল অপচয় ঘটে। মোট অপচয়ের ৬০ শতাংশই ঘটে পারিবারিক পর্যায়ে। রেস্তোরাঁ ও খাদ্যসেবা খাতে ২৮ শতাংশ এবং খুচরা দোকানে ১২ শতাংশ খাবার নষ্ট হয়। মাথাপিছু অপচয়ের দিক থেকে শীর্ষে অবস্থান করছে মালদ্বীপ, যেখানে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২৬০ কেজি খাবার নষ্ট করেন। এর বিপরীতে স্পেনে এই অপচয়ের পরিমাণ সবচেয়ে কম, বছরে মাত্র ৩৯ কেজি।
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক দিয়েও এই অপচয়ের প্রভাব মারাত্মক। প্রতি বছর খাদ্য অপচয়ের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ১ লাখ কোটি ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়। বিশ্বের মোট কৃষিজমির প্রায় ২৮ শতাংশে উৎপাদিত ফসল শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়, যা আয়তনের দিক থেকে কানাডার চেয়েও বড়। এ ছাড়া ভাগাড়ে খাবার পচে তৈরি হওয়া মিথেন গ্যাস বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের ৮ থেকে ১০ শতাংশের জন্য দায়ী।
বিশেষজ্ঞরা ঘরে খাবারের অপচয় রোধে আটটি জরুরি পদক্ষেপ অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন:
১. বাজারের আগে তালিকা তৈরি: প্রয়োজনীয় জিনিসের সঠিক হিসাব করে বাজার করা।
২. মেয়াদের তারিখের তফাত বোঝা: ‘ইউজ বাই’ (নিরাপত্তা) এবং ‘বেস্ট বিফোর’ (মান বজায় থাকার সীমা)-এর পার্থক্য বুঝে খাদ্য ব্যবহার করা।
৩. সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ: ফ্রিজের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখা।
৪. ফ্রিজারের সঠিক ব্যবহার: রান্না করা খাবার, মাংস ও পাউরুটি সময়মতো ফ্রিজারে সংরক্ষণ।
৫. পরিমিত রান্না: চাল বা পাস্তা রান্না করার সময় সঠিক মাপে তৈরি করা।
৬. পুরোনো খাবার আগে ব্যবহার: ফ্রিজ বা তাকে থাকা আগের খাবার আগে শেষ করা।
৭. উদ্বৃত্ত খাবারের পুনর্ব্যবহার: বেঁচে যাওয়া খাবার দিয়ে স্যুপ বা নতুন পদ তৈরি।
৮. জৈব সার বা কম্পোস্ট তৈরি: ফেলে দেওয়া খোসা ও আবর্জনা দিয়ে ঘরেই কম্পোস্ট সার প্রস্তুত করা।
মন্তব্যসমূহ