হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি সচল রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পরিচালিত একটি জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাকে এবার সরাসরি নিশানা করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, এই ব্যবস্থার আওতায় প্রতিদিন রাতে পাঁচ থেকে ছয়টি জাহাজে হামলা চালানো হচ্ছে। বিকল্প পথে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল পরিবহন ঠেকাতে হামলা আরও বাড়ানোরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি।
সোমবার, ১২ অক্টোবর আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান এমন একটি শাটল ব্যবস্থা বন্ধ করতে চাইছে, যার মাধ্যমে ছোট জাহাজে করে তেল নিয়ে বড় ট্যাংকারে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এরপর বড় ট্যাংকারগুলো ওমানের উপকূলসংলগ্ন দক্ষিণাঞ্চলীয় পথ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালির বাইরে চলে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছে তেহরান।
রেজায়ির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড ও ইউএইর সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ছোট জাহাজ থেকে বড় ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে। তার ভাষায়, হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং এই পথে তেল পরিবহনের এমন কর্মকাণ্ডকে তারা ‘চোরাচালান’ হিসেবে দেখছে।
ইরানের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ। যুদ্ধ শুরুর পর কৌশলগত এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
হরমুজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত দক্ষিণাঞ্চলীয় রুটে জাহাজগুলো অনেক সময় রাতে চলাচল করছে এবং নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখছে। ছোট জাহাজ থেকে বড় ট্যাংকারে তেল স্থানান্তরের পর এসব ট্যাংকার ওমান উপসাগর দিয়ে প্রণালির বাইরে চলে যাচ্ছে। পরে কিছু ছোট জাহাজ আবার তেল সংগ্রহের জন্য ফিরে আসছে।
রোববার রাত থেকে সোমবারের মধ্যে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একাধিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি থেকে বেরিয়ে যাওয়া দুটি ট্যাংকার এবং ওমানের সোহার বন্দরের কাছে নোঙর করা একটি জাহাজও রয়েছে। এর আগের সপ্তাহেও বেশ কয়েকটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
শুধু জাহাজ নয়, হরমুজকে ঘিরে ইরানের হুমকির পরিধিও বাড়ছে। রেজায়ি সতর্ক করেছেন, ইরানের জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোয় নতুন করে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হরমুজের আশপাশের স্থাপনাগুলো নিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে মাইন হামলার অভিযোগও সামনে এসেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি জানিয়েছে, সপ্তাহান্তে তিনটি ট্যাংকার মাইনের আঘাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে একটি জাহাজে আগুন লাগার ভিডিওও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে ভিডিওতে সরাসরি মাইন বিস্ফোরণের দৃশ্য দেখা যায়নি।
হরমুজে হামলা বাড়ার ফলে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। আলজাজিরার উদ্ধৃত সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইনওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৩১টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩৮। অক্টোবরের শুরু থেকে অন্তত ১৫টি জাহাজ ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলেও প্রতিষ্ঠানটির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ফলে হরমুজ এখন শুধু সামরিক সংঘাতের কেন্দ্র নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেরও অন্যতম বড় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। বিকল্প রুটে তেল পরিবহন যত বাড়বে, ততই সেটি ঠেকাতে ইরানের হামলার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আর এর প্রভাব পড়তে পারে তেল পরিবহন ব্যয়, বীমা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাজারের জ্বালানির দামের ওপর।
মন্তব্যসমূহ