ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে চীন ও রাশিয়া। কারণ, দেশ দুটি শুধু ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারই নয়, বরং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপ মোকাবিলায় তেহরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সহযোগী।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এটি হবে ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান, যেখানে তেহরানের অর্থনৈতিক টিকে থাকার পথ বন্ধ করাই মূল লক্ষ্য।
ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, যেসব দেশ ইরানকে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য, অর্থ লেনদেন বা তেল বিক্রিতে সহায়তা করবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ইরানের তেল চোরাচালান, মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থা, অর্থ স্থানান্তর, জাহাজ নিবন্ধন এবং ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে সহযোগিতা বন্ধ করতে হবে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর সর্বাত্মক অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না। কারণ এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন এবং বড় সামরিক শক্তি রাশিয়া।
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, ট্রাম্প যে ধরনের সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে চাইছেন, তা এককভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। অতীতে এ ধরনের পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা নিতে হয়েছে।
ইরানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অংশীদার চীন। বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরান থেকে সমুদ্রপথে রপ্তানি হওয়া তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ কিনেছে চীন।
ফলে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে হলে বেইজিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সমঝোতা প্রয়োজন হতে পারে।
তবে চীন-ইরান বাণিজ্য বন্ধ করা ওয়াশিংটনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ চীনের অনেক স্বাধীন তেল শোধনাগার মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল। ফলে নিষেধাজ্ঞা দিলেও দ্রুত কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে লেনদেনকারী চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। তবে এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে বেইজিংও ব্যবস্থা নিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ইউ জিয়ে বলেন, ইরানের অর্থনৈতিক অংশীদারদের ওপর চাপ প্রয়োগ করলেও চীনের সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সহজে পরিবর্তন হবে না।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, নতুন নিষেধাজ্ঞা সমস্যার সমাধান করবে না। দেশটি কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, রাশিয়াও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার বাণিজ্যের পরিমাণ চীনের তুলনায় কম, তবে দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক দ্রুত বেড়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান ২০ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে। একই সঙ্গে দুই দেশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বিকল্প বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগেই কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে মস্কোকে ইরান থেকে দূরে সরাতে নতুন চাপ প্রয়োগের সুযোগ সীমিত ওয়াশিংটনের।
এদিকে ইরানও পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প পথ তৈরির চেষ্টা করছে। ব্রিকস এবং এর নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তেহরান।
ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে দেশটি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের নতুন অর্থনৈতিক অভিযানকে সমালোচনা করে বলেছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ নীতির ধারাবাহিকতা এবং এর ফলাফল আগের মতোই হবে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা শুধু তেহরানের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
ইরানের ওপর পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকর করতে হলে ওয়াশিংটনকে একই সঙ্গে বেইজিং ও মস্কোর সঙ্গে জটিল সমীকরণ মোকাবিলা করতে হবে।
মন্তব্যসমূহ