প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। সফরের শুরুতে তিনি মালয়েশিয়ায় যান, এরপর বেইজিংয়ে চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন।
প্রথম দেখায় সফরটি নিয়মিত কূটনৈতিক সফর মনে হলেও এর কৌশলগত তাৎপর্য কম নয়। কারণ, চীন দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম বড় উন্নয়ন সহযোগী ও বাণিজ্য অংশীদার। তবে এবার দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার বার্তা এসেছে যৌথ ঘোষণায়।
বেইজিং সফর শেষে প্রকাশিত যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও চীন ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গড়তে কাজ করবে। এর মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সফরে যোগাযোগ অবকাঠামো, বন্দর আধুনিকীকরণ, পানি ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ, শিল্প স্থানান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের দুর্বল বেসরকারি খাত চাঙা করতে চীনা বিনিয়োগ ও কারখানা স্থানান্তরের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
দুই দেশ প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ‘২+২ সংলাপ’ চালুর বিষয়েও একমত হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের কাঠামো সাধারণত গভীর কৌশলগত সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠে। ফলে এটি ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন মাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মান্দারিন ভাষা শিক্ষার বিষয়েও সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু শিক্ষা সহযোগিতা নয়, বরং বাংলাদেশে চীনের সাংস্কৃতিক ও নরম প্রভাব বৃদ্ধির অংশ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
বেইজিং বাংলাদেশকে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় যোগদানের প্রচেষ্টায় সমর্থনের কথাও জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে এসব প্ল্যাটফর্মে চীনের সমর্থন ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে সফরটির আরেকটি বড় দিক হলো ভারত-চীন ভারসাম্য। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়েছে। অনেকের ধারণা ছিল, তারেক রহমানের সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে দ্রুত এগোবে। কিন্তু প্রথম বড় বিদেশ সফরে চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া সেই প্রত্যাশাকে নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ভারতের জন্য এই সফর কৌশলগত অস্বস্তির কারণ হতে পারে। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব বৃদ্ধিকে নয়াদিল্লি সবসময় সতর্ক দৃষ্টিতে দেখে। বিশেষ করে বন্দর, অবকাঠামো, নদী ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরক্ষা সংলাপের মতো ক্ষেত্রগুলোতে চীনের উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তা ভাবনায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে ঢাকার দৃষ্টিকোণ থেকে চীনকে গুরুত্ব দেওয়ার বাস্তব কারণও আছে। অর্থনৈতিক গতি কমে যাওয়া, বিনিয়োগের প্রয়োজন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের চাপ মোকাবিলায় চীনা মূলধন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলাও নতুন সরকারের জন্য প্রয়োজনীয়।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সফরের গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষের মধ্যে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে। বিপরীতে ভারত নিয়ে রাজনৈতিক ও জনমনে নানা সংশয় আছে। ফলে মেয়াদের শুরুতে চীন সফর তারেক সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক নিরাপদ বার্তা বহন করেছে।
তবে ঝুঁকিও কম নয়। নতুন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির কথা বলেছে। এই নীতির মূল লক্ষ্য জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করা। কিন্তু যদি ধারণা তৈরি হয় যে ঢাকা বেইজিংয়ের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে, তাহলে সেই নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের কথা বলে আসছে। বাস্তবে বিভিন্ন সময়ে এই ভারসাম্য একেক দিকে ঝুঁকেছে। শেখ হাসিনার আমলে ভারত ঘনিষ্ঠতা ছিল বেশি দৃশ্যমান। এখন নতুন সরকারের সামনে সুযোগ তৈরি হয়েছে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের কার্যকর ভারসাম্য গড়ে তোলার।
সফরটি তাই শুধু ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় নয়। এটি বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক অবস্থান, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার মধ্যে পথ খোঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
মন্তব্যসমূহ