ঢাকা    রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ ৭ রবিউস সানি ১৪৪৮ হিজরি
বাংলাদেশ সময়
বাংলা ভিউজ

৬ আগস্ট ১৯৪৫: এক পারমাণবিক বিস্ফোরণে শুরু হয়েছিল নতুন যুগ

৬ আগস্ট ১৯৪৫: এক পারমাণবিক বিস্ফোরণে শুরু হয়েছিল নতুন যুগ
ছবি: সংগৃহীত
ফলো করুন

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে আছে। ওই ঘটনার ৮১ বছর পূর্তিতে আবারও সামনে এসেছে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা, নিরস্ত্রীকরণ এবং বিশ্ব নিরাপত্তার প্রশ্ন।

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক হামলাই এখন পর্যন্ত যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একমাত্র ঘটনা। এসব হামলা শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে বড় ভূমিকা রাখেনি, একই সঙ্গে বিশ্বকে প্রবেশ করিয়েছে পারমাণবিক যুগে।

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর ‘লিটল বয়’ নামের পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে।

তখন হিরোশিমা শহরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ বসবাস করতেন। বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তীব্র তাপ, বিস্ফোরণের চাপ এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।

ইতিহাসবিদদের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন।

হিরোশিমা হামলার তিন দিন পর, ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র জাপানের নাগাসাকি শহরে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ নিক্ষেপ করে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শিল্পনগরী হওয়ায় নাগাসাকিও ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে পড়ে।

১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ নিহত হন বলে বিভিন্ন হিসাব থেকে জানা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, জাপানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধ এড়ানোর জন্য পারমাণবিক হামলা চালানো হয়েছিল। তবে অনেক ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষক মনে করেন, তখন জাপান দুর্বল অবস্থায় ছিল এবং বেসামরিক মানুষের ওপর এমন হামলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র সাধারণ অস্ত্রের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার ধ্বংসক্ষমতা রাখে। পরমাণুর বিভাজন থেকে উৎপন্ন বিপুল শক্তি এক মুহূর্তে একটি শহর ধ্বংস করতে পারে।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনায় মানুষ শুধু বিস্ফোরণ ও আগুনে নয়, দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক জীবিত মানুষ পরবর্তী দশকগুলোতে নানা শারীরিক সমস্যা ও মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করেছেন।

পারমাণবিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের জাপানি ভাষায় বলা হয় ‘হিবাকুশা’। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

হিরোশিমা ও নাগাসাকি হামলার পর বিশ্ব রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেও ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়।

এরপর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে। শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধকে আরও তীব্র করে তোলে।

একই সঙ্গে পারমাণবিক যুদ্ধের ভয় থেকেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

বর্তমান বিশ্বেও পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সংঘাত, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির দুর্বলতা এবং পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে এই হুমকিকে।

পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো এগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখলেও নিরস্ত্রীকরণপন্থিরা মনে করেন, হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ মানবজাতির জন্য এক স্থায়ী সতর্কবার্তা।

৮১ বছর পরও হিরোশিমা বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়, পারমাণবিক যুদ্ধের পরিণতি শুধু একটি দেশের নয়, পুরো মানবজাতির জন্য ভয়াবহ হতে পারে।

ট্যাগ : জাপান হিরোশিমা পারমাণবিক বোমা

বাংলা ভিউজ

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬


৬ আগস্ট ১৯৪৫: এক পারমাণবিক বিস্ফোরণে শুরু হয়েছিল নতুন যুগ

প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬

featured Image

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে আছে। ওই ঘটনার ৮১ বছর পূর্তিতে আবারও সামনে এসেছে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা, নিরস্ত্রীকরণ এবং বিশ্ব নিরাপত্তার প্রশ্ন।

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক হামলাই এখন পর্যন্ত যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একমাত্র ঘটনা। এসব হামলা শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে বড় ভূমিকা রাখেনি, একই সঙ্গে বিশ্বকে প্রবেশ করিয়েছে পারমাণবিক যুগে।

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর ‘লিটল বয়’ নামের পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে।

তখন হিরোশিমা শহরে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ বসবাস করতেন। বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তীব্র তাপ, বিস্ফোরণের চাপ এবং তেজস্ক্রিয় বিকিরণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।

ইতিহাসবিদদের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন।

হিরোশিমা হামলার তিন দিন পর, ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র জাপানের নাগাসাকি শহরে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ নিক্ষেপ করে। গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শিল্পনগরী হওয়ায় নাগাসাকিও ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে পড়ে।

১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ নিহত হন বলে বিভিন্ন হিসাব থেকে জানা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, জাপানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধ এড়ানোর জন্য পারমাণবিক হামলা চালানো হয়েছিল। তবে অনেক ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষক মনে করেন, তখন জাপান দুর্বল অবস্থায় ছিল এবং বেসামরিক মানুষের ওপর এমন হামলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র সাধারণ অস্ত্রের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার ধ্বংসক্ষমতা রাখে। পরমাণুর বিভাজন থেকে উৎপন্ন বিপুল শক্তি এক মুহূর্তে একটি শহর ধ্বংস করতে পারে।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির ঘটনায় মানুষ শুধু বিস্ফোরণ ও আগুনে নয়, দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেক জীবিত মানুষ পরবর্তী দশকগুলোতে নানা শারীরিক সমস্যা ও মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করেছেন।

পারমাণবিক হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের জাপানি ভাষায় বলা হয় ‘হিবাকুশা’। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

হিরোশিমা ও নাগাসাকি হামলার পর বিশ্ব রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলেও ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়।

এরপর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে। শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধকে আরও তীব্র করে তোলে।

একই সঙ্গে পারমাণবিক যুদ্ধের ভয় থেকেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

বর্তমান বিশ্বেও পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সংঘাত, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির দুর্বলতা এবং পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় এনেছে এই হুমকিকে।

পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো এগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখলেও নিরস্ত্রীকরণপন্থিরা মনে করেন, হিরোশিমা ও নাগাসাকির ধ্বংসযজ্ঞ মানবজাতির জন্য এক স্থায়ী সতর্কবার্তা।

৮১ বছর পরও হিরোশিমা বিশ্বকে মনে করিয়ে দেয়, পারমাণবিক যুদ্ধের পরিণতি শুধু একটি দেশের নয়, পুরো মানবজাতির জন্য ভয়াবহ হতে পারে।


বাংলা ভিউজ

প্রকাশক: মোহাম্মদ জুনাইদ
সম্পাদক: মোঃ জাকির হোসেন
ঠিকানা: ট-৩৯/১, হাসনা মঞ্জিল, গুলশান, ঢাকা - ১২১২
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বাংলা ভিউজ