ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে স্পষ্ট পরাজয়ের পর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘শাসনব্যবস্থায় অভ্যুত্থান’ (Coup) ঘটানোর গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন দেশটির বিরোধী দলীয় রাজনীতিক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের দাবি, পরাজয় আড়াল করে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’ (Shin Bet)-কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন নেতানিয়াহু।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অভূতপূর্ব ও রেকর্ডসংখ্যক ভোটাধিকার প্রয়োগের মুখে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট বিরোধীদের তুলনায় মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়ে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের এক সপ্তাহের বেশি সময় পার হলেও দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সাংবিধানিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শিন বেত প্রধান ডেভিড জিনি নির্বাচনে ফিলিস্তিনিদের ভোট প্রদানের বিষয়ে একটি বিতর্কিত তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্যপ্রমাণ প্রকাশ না করেই ভোট জালিয়াতি, ঘুষ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ এনে এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। একই সাথে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন ‘রা'আম’ ও ‘জয়েন্ট লিস্ট’ দল দুটিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার জোর তৎপরতা চলছে, যারা পার্লামেন্টে (নেসেট) সম্মিলিতভাবে রেকর্ড ১৯টি আসন লাভ করেছে। সমালোচকদের মতে, আরব দলগুলোর ঐতিহাসিক এই অর্জনকে বিতর্কিত করে বিরোধীদের সরকার গঠনের পথ রুদ্ধ করাই নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য।
ইতিমধ্যেই শিন বেতের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন মিডল ইস্ট আইয়ের সহযোগী লেখক আবদ আবু শাহাদেহ। এ ছাড়া শিন বেত প্রধান আহমাদ তিবি, সামি আবু শাহাদেহ, মানসুর আব্বাস ও আয়মান ওদেহের মতো শীর্ষ আরব নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর এসেছে।
এ পরিস্থিতিতে দেশটির বিরোধী ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘পুলিশ পরোয়ানা ছাড়া রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে, শিন বেত প্রমাণ ছাড়া নির্বাচিত এমপিদের জেরার চেষ্টা করছে এবং বিদায়ী সরকার নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল মেনে নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।’ তিনি সরাসরি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলের অভ্যুত্থানের অভিযোগ তোলেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ একই অভিযোগ করে বলেন, নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে নিজের অনুগত কর্মকর্তাদের কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের গণতন্ত্র ধ্বংস এবং নির্বাচনের ফলাফল চুরি করার নোংরা ষড়যন্ত্র করছেন। অন্যদিকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পাওয়া গাদি আইজেনকট সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে গণতন্ত্র নস্যাতের একটি সুসংগঠিত নকশা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ইসরায়েলি গণমাধ্যমের বিশ্লেষকেরাও এক সুরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রভাবশালী হারেৎজ পত্রিকার বিশ্লেষক আমোস হারেল লিখেছেন, নেতানিয়াহু দেশকে ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল সাংবিধানিক সংকটে ফেলছেন। অর্থনৈতিক দৈনিক ক্যালকালিস্টের মোশে গোরালি এবং ইয়েনেটের সিনিয়র অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যানও সতর্ক করেছেন যে, নির্বাচনের ফল উল্টে দিতে অনুগত গোয়েন্দা সংস্থাকে নামিয়ে ইসরায়েল এখন একটি বিপজ্জনক স্বৈরাচারী অভ্যুত্থান প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই














মন্তব্যসমূহ